রাজধানীর সড়কে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও কাজে লাগানো হচ্ছে। প্রতিদিন দুই শিফটে তারা এ দায়িত্ব পালন করছেন। গত তিন মাসে এ কাজে নিয়োজিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে মোট ৬০০ শিক্ষার্থী সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ সংখ্যা আরো বাড়াতে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ট্রাফিকের পাশাপাশি রাস্তায় নিয়োজিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো হলেও এখনো শৃঙ্খলা ফেরেনি ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনায়।
এখনো রাজধানীর সড়কে নির্ধারিত ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং, এলোমেলোভাবে উল্টোপথে গাড়ি চালানো, পারমিটবিহীন গাড়ি, গুরুত্বপূর্ণ প্রধান প্রধান সড়কে অটোরিকশার দখলের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। প্রায়ই সড়কে চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে ট্রাফিকের দায়িত্বে নিয়োজিতদের বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। অনিয়মের বৃত্ত ভাঙতে পারেনি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। রাজধানীর সড়কে এখনো দুর্ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি তীব্র যানজটের ভোগান্তিও এখন নিয়মিত দৃশ্য।
এ বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের বক্তব্য হলো সীমিত শক্তি দিয়ে ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশকে সহযোগিতার জন্য তারা আরো প্রশিক্ষিত হয়ে উঠছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এসব সংকট দূর হয়ে যাবে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়ে। সে সময় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দিন-রাত কাজ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। টানা ছয়দিন তারা ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ বেগ পেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। রাজধানীবাসীকে সচেতন করতে গত ২১ অক্টোবর থেকে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে ‘ট্রাফিক পক্ষ’ আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ট্রাফিক পক্ষের শুরুর দিকে পুলিশের পাশাপাশি ঢাকার সড়কে কাজ করার জন্য এক হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়। শুরুতে এর সঙ্গে যুক্ত হন ২৯১ শিক্ষার্থী। বর্তমানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬০০।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার সড়কে দায়িত্বরত শিক্ষার্থীদের প্রথম শিফট শুরু হয় সকাল ৮টায়। এটি থাকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। সেখানে দায়িত্ব পালন করেন ৩০০ শিক্ষার্থী। আর দ্বিতীয় শিফট চলে বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। সেখানেও ৩০০ শিক্ষার্থী দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনের জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দৈনিক সম্মানী দেয়া হচ্ছে ৪০৫ টাকা করে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত এ শিক্ষার্থীদের জন্য বেশকিছু করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছে ডিএমপি। এর মধ্যে রয়েছে পথচারীদের সচেতন করা, উল্টোপথে যানবাহন চালাতে না দেয়া, বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের নির্ধারিত স্থানে দাঁড়াতে উৎসাহিত করা, মোড়ের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো যানবাহন দাঁড়াতে না দেয়া, মূল সড়কে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে না দেয়া এবং সর্বোচ্চ সহনশীলতা প্রদর্শনসহ সবার সঙ্গে মার্জিত আচরণ করা।
এছাড়া তাদের জন্য নির্ধারিত কর্মপদ্ধতিতে বেশকিছু বর্জনীয় বিষয়ও যুক্ত করেছে ডিএমপি। এতে শিক্ষার্থীদের যেগুলো করতে নিষেধ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চলন্ত যানবাহনের সামনে দাঁড়ানো, সড়ক ব্যবহারকারী চালক, পথচারী ও যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, যানবাহনের কাগজপত্র তল্লাশি করা, ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি ছাড়া কাজ করা ও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ না করা। তবে মাঝেমধ্যেই এসব নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে রাজধানীর গুলশান, মিরপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সড়ক ব্যবহারকারীদের সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত শিক্ষার্থীদের বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। এর জের ধরে বিভিন্ন সময় এ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
ট্রাফিক পুলিশের ভাষ্যমতে, তাদের এখনো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তারা সড়কে সক্রিয় থাকলেও এখনো আগের মতো কাজে ফিরতে পারেননি। ফলে এ সুযোগ নিচ্ছে অনেকেই। বিশেষ করে মোড়ে মোড়ে অটোচালকদের আক্রমণের শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছেন ট্রাফিকের একাধিক কর্মকর্তা ও সদস্য। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাঠে আমাদের সদস্যদের কোনো কমতি নেই। আগে প্রতিটি ট্রাফিক সিগন্যালে যে কয়জন দায়িত্ব পালন করতেন, এখনো ঠিক সে কয়জনই দায়িত্ব পালন করছেন। তদারকিরও কমতি নেই।’
এর পরও সমস্যা কোথায় হচ্ছে জানতে চাইলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘সমস্যা হলো আমাদের আগের মতো নিয়ন্ত্রণ নেই। এজন্য প্রয়োজনমতো আইনের প্রয়োগও করতে পারছি না।’
ট্রাফিকে নিয়োজিত শিক্ষার্থীদের কো-অর্ডিনেটর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মো. দাইয়ান নাফিস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তারা নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি সড়কে দায়িত্ব পালন করে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত করে তুলতে পারলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে। এছাড়া দায়িত্ব পালনের সময় শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে হামলার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে পুলিশের সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকার সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত ৬০০ শিক্ষার্থী দায়িত্ব পালন করছেন। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নগরবাসীর সচেতনতার বিকল্প নেই। নগরবাসী যদি ট্রাফিক আইন না মেনে যেখানে-সেখানে পার্কিং, উল্টোপথে চলাচল করার মতো সড়ক শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ না করেন, তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।’