দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান চলাচল করছে। তবে ই-থ্রি হুইলার বাদ দিলে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা মাত্র ৬৬৯। শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে আয়োজিত ‘দ্য ইলেকট্রিক ভেহিকল: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড প্রসপেক্টস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। অন্যদিকে দেশে চলাচলকারী প্রায় ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানের প্রায় ৯০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে তৈরি হলেও খাতটি এখনো অসংগঠিত।
এতে আরো বলা হয়, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে চার্জিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং উচ্চ প্রাথমিক ব্যয় এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে দেশের পরিবহন খাত মোট পেট্রোলিয়াম জ্বালানির ৬৩ দশমিক ৪১ শতাংশ ব্যবহার করে। তাই জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বে নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির প্রায় ২৫ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক। অর্থাৎ প্রতি চারটি নতুন গাড়ির একটি ছিল বৈদ্যুতিক। নরওয়েতে নতুন গাড়ি বিক্রির প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং চীনে ৫৪ শতাংশই বৈদ্যুতিক বা নতুন জ্বালানিচালিত যান। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চার্জিং অবকাঠামো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং নীতিগত সহায়তার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা।
প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক যান উৎপাদন উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক ছাড় দেয়া হয়েছে। উচ্চ মূল্য সংযোজনভিত্তিক সংযোজন শিল্পে অধিকাংশ কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর ছাড়, চার্জিং স্টেশনের সরঞ্জামে আমদানি শুল্ক ১ শতাংশে নামিয়ে আনা, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামে ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর ছাড় এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতির সুবিধা দেয়া হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে আরো বলা হয়, পরিচালন ব্যয়ের দিক থেকে বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রচলিত জ্বালানিচালিত যানবাহনের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। প্রতি কিলোমিটারে একটি বৈদ্যুতিক যান চালাতে ব্যয় হয় প্রায় ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ৮ টাকা। একই দূরত্বে পেট্রোল, ডিজেল বা সিএনজিচালিত যানবাহনে ব্যয় হয় প্রায় ১১ থেকে ১৪ টাকা। এছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম।
তবে খাতটির বিকাশে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশনের অভাব, বৈদ্যুতিক যানবাহনের উচ্চ মূল্য, ব্যাটারির নিরাপত্তা ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ব্যাটারি পরিবর্তনের ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দেশের বিদ্যুৎ সংকট। এতে বলা হয়, বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন ভবনে বৈদ্যুতিক যান উপযোগী অবকাঠামো নিশ্চিত করা, প্রথম ধাপে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ৩০০ থেকে ৫০০ সরকারি বৈদ্যুতিক বাস চালুর সুপারিশ করা হয়।
সেমিনারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেইন, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদসহ খাতসংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।