নোয়াখালীতে প্রতিদিনই বায়ুদূষণ বাড়ছে। এতে হাঁচি-কাশিসহ শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অপরিকল্পিত ও ধীরগতির উন্নয়নকাজ, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা ও আবর্জনা পোড়ানোর ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে দূষণে দেশের শীর্ষ পাঁচ জায়গার তালিকায়ও স্থান পেয়েছে নোয়াখালী। প্রশাসন বলছে, দ্রুত উন্নয়নকাজ সম্পন্নসহ দূষণ রোধে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ।
নোয়াখালীর মাইজদী-চৌমুহনী সড়ক ফোরলেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৭ সালে। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে ১৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়ক শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেছে কাজ তো শেষই হয়নি, বরং আরো দুই ধাপে বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ, যা চলবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। সড়কটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ায় ধুলায় ধূসর সড়কটি দিনের বেলায়ও অন্ধকার দেখায়। এমন দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে গত পাঁচ বছর ধরে ভুগছেন যাত্রী, পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা। শুধু মাইজদী-চৌমুহনী সড়কই নয়, জেলার বেগমগঞ্জ-কুমিল্লা, চৌমুহনী-ফেনী ও চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর সড়কেও চলছে উন্নয়নকাজ। ফলে খোঁড়াখুঁড়ি, বহুতল ভবন ভাঙন, ইট-বালি ও পাথরের স্তূপ থেকে তৈরি হওয়া ধুলা আর বালিতে অতিষ্ঠ মানুষ।
সোনাইমুড়ি উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুসরাত জাহান। তিনি প্রতিদিন জেলা শহর মাইজদীতে ১৭ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যান কর্মস্থলে। এ শিক্ষকের মতে, খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সড়কে গর্ত তৈরি হয়েছে, পুরো রাস্তাই খানাখন্দে ভরে গেছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াত করতে গিয়ে শরীর ব্যথা হয়ে যায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত বালির কারণে চোখ ও নাকের জ্বালাপোড়া হয়। বেড়ে গেছে হাঁচি ও কাশি। গত তিন বছরে শরীরের ব্যথা, সর্দি ও কাশির কারণে বারবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে তাকে।
শামীম আরা নামে অন্য এক শিক্ষক বলেন, তিনি দীর্ঘদিন থেকে অ্যাজমায় ভুগছেন। কিছু নিয়ম-কানুন মেনে সবসময় সুস্থ থাকার চেষ্টা করছেন। ব্যাপক বায়ুদূষণের কারণে ভয়ঙ্কর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাকে। সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক নাছের বলেন, ধুলোবালির কারণে দিনের বেলায়ও সামনের গাড়ি দেখা যায় না। প্রায়ই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে।
শুধু সড়ক উন্নয়ন কাজে নয়, জনবহুল এলাকায় আবর্জনা পোড়ানোর কারণেও বাড়ছে দূষণ। গত কয়েক বছর পর্যন্ত চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর সড়কে তফাদার বাড়ির পুল এলাকায় পোড়া হচ্ছে চৌমুহনী পৌরসভার আবর্জনা। আবার চৌমুহনী-সোনাইমুড়ি সড়ককে বিসিক শিল্প নগরীর পাশেও পোড়ানো হচ্ছে পৌরসভার আবর্জনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চৌমুহনী পৌরসভার বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও দোকানের ময়লা এনে ফেলা হয় এ দুটি স্থানে। ভোরের দিকে ফেলা এসব ময়লায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এতে করে প্রতিদিন ধোঁয়ায় ভীষণ দুর্গন্ধ ছড়ায়। তাছাড়া আগুন ও ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছগাছালি।
সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ‘৬৪ জেলার বায়ুদূষণ সমীক্ষা ২০২১’
নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে দূষণ তালিকার শীর্ষে গাজীপুর। একই তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে নোয়াখালী। প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুতে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার দৈনিক আদর্শমান ৬৫ মাইক্রোগ্রাম থাকার কথা থাকলেও নোয়াখালীর বায়ুতে প্রতি ঘনমিটারে রয়েছে ২০৪ দশমিক শূন্য ১ মাইক্রোগ্রাম, যা আদর্শ মানের তিন গুণেরও বেশি। এমন বায়ুদূষণ ফুসফুসের জটিলতাসহ মানুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। একই সঙ্গে পরাগায়ন সমস্যার কারণে ব্যাপক ফলন বিপর্যয়সহ পরিবেশ-প্রতিবেশও হুমকিতে পড়বে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।
এ বিষয়ে কথা হয় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার মু. আরিফুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নয়নকাজ শেষ করা দরকার। যদি তা না হয়, তাহলে ধীরগতির কারণে কিংবা খোঁড়াখুঁড়ি ও বহুতল ভবন ভাঙনের কারণে প্রচুর বালি ওড়ে বাতাসে। এছাড়া আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে যত্রযত্র ময়লা-আবর্জনা পোড়ানোর কারণে ব্যাপক বায়ুদূষণ তৈরি হয়। বায়ুদূষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের শ্বাসকষ্ট তথা ফুসফুসজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রজনন স্বাস্থ্যও হুমকিতে পড়বে। আবার প্রতিবন্ধী হয়ে নবজাতক জন্ম নেবে। এছাড়া পরাগায়ন কমে গেলে ফল ও ফসল কমে যাবে। তাই এখনই বায়ুদূষণ রোধে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
এ বিষয়ে নানা পদক্ষেপের কথা বলেছেন, জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, মাসিক সমন্বয় সভাগুলোয় সড়ক ও এলজিইডি বিভাগকে দ্রুত সড়ক উন্নয়নকাজ শেষ করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন সড়কে পানি দেয়ার ব্যবস্থা করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার প্রথম শ্রেণীর পৌরসভাগুলোয় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নোয়াখালী পৌরসভা, বসুরহাট, চৌমুহনী পৌরসভাসহ নোয়াখালীর বেশ কয়েকটি পৌরসভায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি মনে করেন, দূষণের তীব্রতা সাময়িক। দ্রুত উন্নয়নকাজ ও উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলেই এ থেকে পরিত্রাণ মিলবে।