সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও স্বশাসিত সংস্থার উদ্বৃত্ত তহবিল সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার আইন করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এ আইনের আওতায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছ থেকে ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা নেয় সরকার। বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ বিপুল পরিমাণ দেশী ও বৈদেশিক দায় মেটাতে এ অর্থ ফেরত চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ।
তবে আইনের আওতায় তফসিলভুক্ত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার পর তা ফেরত দেয়ার কোনো বিধান নেই বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ। গত ৪ জুন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে জানিয়ে দেয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, বিপিডিবি নির্দিষ্ট আইন অনুসরণ করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ প্রদান করেছে। ‘সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানশিয়াল কর্পোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহের তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন, ২০২০’ অনুসারে বিপিডিবির জমা দেয়া অর্থ সংযুক্ত তহবিলের অংশ।
অর্থ বিভাগ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সংবিধানের ৯০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোষাগারে জমা দেয়া অর্থ ফেরত দেয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে নতুন আইন পাস ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া টাকা ফেরত দেয়া যাবে না।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিপিডিবির আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উদ্বৃত্ত তহবিল হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থ বিভাগ আইনের বিষয়টি উল্লেখ করে এই টাকা ফেরত দেয়ার সুযোগ দেখছে না। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সরকার চাইলে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে। আমরা পুনরায় বিষয়টি বিবেচনার জন্য বলব।’
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে উদ্বৃত্ত অর্থ জমার আইন করার পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিপিডিবি ২ হাজার কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭০০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। সব মিলিয়ে তিন অর্থবছরে মোট ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে বিপিডিবি।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় ও আমদানি বিদ্যুৎ ক্রয়ের সিংহভাগ বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। এ অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপিডিবি বড় আর্থিক সংকটে পড়েছে। এমনকি বৈদেশিক দায় মেটাতে অর্থ সংকটের বিষয়টি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন বিপিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। এমনকি আদানির বকেয়া বিল পরিশোধে বড় আকারের চাপ তৈরি হয়। বকেয়া বিলের ওপর ১৫ শতাংশ হারে সুদ আরোপের বিষয়টি বিপিডিবিকে শঙ্কায় ফেলে। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া অর্থ ফেরত পেলে তা সংস্থাটির জন্য চাপ মোকাবেলায় সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ বিপিডিবির বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক দেনা ছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আর্থিক সংকটে পড়ায় আইন করে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির উদ্বৃত্ত তহবিল রাষ্ট্রের কোষাগারে নিয়ে নেয়। বিপিডিবি যেহেতু বিপুল পরিমাণ দায় পরিশোধ করছে, ফলে তার বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে অর্থ বিভাগকে দেয়া বিপিডিবির ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ফেরত দেয়া হলে আর্থিক দায় মেটানো সহজ হবে। কিন্তু অর্থ বিভাগ থেকে এ অর্থ ফেরত দেয়া হবে না বলে চিঠি দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, অর্থ বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অর্থ ফেরত না দেয়ার বিষয়টি জানানোর পর পুনরায় বিদ্যুৎ বিভাগ বিষয়টি নিয়ে অনুরোধ জানাবে। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তুলে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিপিডিবির আর্থিক সংকটের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হবে।
উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে তা কম মূল্যে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করায় বিগত বছরগুলোয় বিপুল পরিমাণ আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে বিপিডিবির। এ দেনা মেটাতে প্রতি বছর বড় ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। তার পরও বিপিডিবির আর্থিক বোঝা বাড়ছে। এ দেনা থেকে বের হতে তিন অর্থবছরের মধ্যে ভর্তুকির অর্থ সমন্বয় করার কথা ভাবছে সরকার। এ সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কীভাবে কমিয়ে আনা যায় তার একটি রোডম্যাপও তৈরি হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও বিক্রয় মূল্যের ব্যবধান কমে আসার প্রাক্কলন করা হয়েছে।