ইঞ্জিন বিকলে তীব্র শিডিউল বিপর্যয়, বিঘ্নিত রেলসেবা

আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভের সংখ্যা। দৈনিক চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ সরবরাহও মিলছে না।

আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভের সংখ্যা। দৈনিক চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ সরবরাহও মিলছে না। আবার সরবরাহ পাওয়া ইঞ্জিনগুলোয় রয়েছে ত্রুটি। তাই তীব্র শিডিউল বিপর্যয়ে রয়েছে রেলের গুরুত্বপূর্ণ সেবা অঞ্চলটি। এতে পথিমধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেন আটকে থাকা, বিলম্বে যাত্রা শুরু ও গন্তব্যে পৌঁছানোর পাশাপাশি ট্রেনের যাত্রা বাতিলের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

রেলের পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ প্রবর্তিত ওয়ার্কিং টাইম টেবিল অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে দৈনিক ইঞ্জিনের চাহিদা ১১৯টি। গুডস ট্রেনের জন্য ১৬টি ছাড়া বাকি ইঞ্জিনগুলো যাত্রীবাহী ট্রেনের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু প্রকৌশল বিভাগ প্রতিদিন ৭৫-৭৮টির বেশি ইঞ্জিন সরবরাহ দিতে পারছে না। আবার সরবরাহ দেয়া ইঞ্জিনগুলোও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় চলন্ত অবস্থায় ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানা ট্রাফিক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েছে রেলওয়ে। আগে সীমিত আকারে পথিমধ্যে ইঞ্জিন ফেইলিউর হলেও বর্তমানে সেটি রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে গেছে। যার কারণে রেলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেনের পাশাপাশি প্রথম শ্রেণীর ট্রেনগুলোর যাত্রা শুরু, গন্তব্যে পৌঁছানো, পথিমধ্যে অলস বসে থাকা কিংবা যাত্রা বাতিলের মতো ঘটনা ঘটছে।

জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পূর্বাঞ্চলের মিটারগেজ রেলপথ ধারাবাহিকভাবে ডুয়াল গেজে রূপান্তর হচ্ছে। কয়েক বছর আগেই মিটার গেজের জন্য ৭০টি ইঞ্জিন ক্রয়ের একটি প্রকল্প ছিল। কিন্তু অর্থায়ন জটিলতায় কয়েক দফায় বিলম্বিত অবস্থায় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। এখন নতুন করে ইঞ্জিন আমদানির একাধিক উদ্যোগ নোয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরনো ইঞ্জিনের মাধ্যমে ট্রেন সেবা চালানোর কারণে সংকট বেড়ে গেছে। তাছাড়া নতুন নতুন রেলপথ নির্মাণ, নতুন ট্রেন সার্ভিস চালুর ফলেও ইঞ্জিনের ওপর চাপ বেড়েছে। পুরনো ইঞ্জিনগুলো দৃশ্যমান মেরামতের মাধ্যমে সার্ভিসে যুক্ত করা ও নতুন ইঞ্জিন আমদানি কার্যক্রম শুরু হলে রেলের লোকোমোটিভ সংকট কমে সেবার মান আরো বাড়ানো সম্ভব।’

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৭ জুন বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন কুমিল্লা ছেড়ে আসার সময় ২৯১৫ নং ইঞ্জিনের ট্রাকশন মোটরের সাপোর্ট বিয়ারিং ভেঙে যায়। লাকসাম থেকে পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন নং-৩০০১ এনে ওই ট্রেনে লাগানো হলেও প্রায় ২ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। এরপর ট্রেনটি নাওটি স্টেশন যাওয়ার পর ৩০০১ নং ইঞ্জিন আবার বিকল হয়। তবে লোকোমাস্টারসহ রানিং স্টাফদের সহায়তায় ইঞ্জিনটি ফের চালু করে ট্রেনটি চট্টগ্রামে যেতে আরো ২০ মিনিট বিলম্ব হয়। একইভাবে ১৮ জুন বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন ময়মনসিংহে যাওয়ার সময় ২৯২৪ নং ইঞ্জিন পাহাড়তলী স্টেশনে ফ্যান ফিউজ নষ্ট হয়ে যায়। বিকল্প ইঞ্জিন ডাকা হলেও না থাকায় পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ থেকে মেকানিক এনে ইঞ্জিনটি ঠিক করা হয়। এতে শুধু পাহাড়তলী স্টেশনেই ট্রেনটির বিলম্ব হয় দেড় ঘণ্টা। একই দিন ৭৪১ নং তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে ফৌজদারহাট যাওয়ার পর ট্রেনের ৩০০৬ নং ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। পরে রিলিফ ইঞ্জিন ৩০১৪ গিয়ে ট্রেনটিকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছতে কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব করে। ১৮ জুন চট্টগ্রাম-ঢাকাগামী গোধূলি এক্সপ্রেস ট্রেন হাসানপুর স্টেশনে গিয়ে ৩০২৬ নং ইঞ্জিন বিকল হয়। রিলিফ ইঞ্জিন ডাকা হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কুমিল্লায় অপেক্ষায় থাকা মালগাড়ি থেকে ৩০০১ নং ইঞ্জিন খুলে নিয়ে ট্রেনটি ঢাকায় নিয়ে যেতে ৪ ঘণ্টা বিলম্ব হয়েছে। ১৯ জুন ঢাকা-কক্সবাজার রুটের পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন (নং-৩০২২) মন্দবাগ স্টেশনে যাওয়ার পর বিকল হয়। আখাউড়া থেকে রিলিফ ইঞ্জিন নং-২৯৩৩ গিয়ে ট্রেনটিকে চট্টগ্রাম নিয়ে যেতে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা বিলম্ব করেছে। একই দিন কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন নং-৩০২০ -এর ব্লোয়ার মোটর পুড়ে নষ্ট হয়ে গেলে বিকল্প ইঞ্জিন নং-৩০১৪ সংযুক্ত করে গন্তব্যে পৌঁছতে ট্রেনটির বিলম্ব হয় প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা। ২২ জুন পর্যটক ব্রাহ্মণবাড়িয়া আউটারে এসে ৩০ মিনিট ইঞ্জিন বিকলের কারণে বসে থাকার পর মেরামত করে আখাউড়ায় এসে ৩০২৩ নং ইঞ্জিন ফের বিকল হয়ে যায়। ট্রেনটি আখাউড়া গিয়ে ফের ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর ২ ঘণ্টা বসে থাকার পর ফিট দিয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছে। ২২ জুন ৮২২ (কক্সবাজার-চট্টগ্রাম) ও ৮২৩ (চট্টগ্রাম-কক্সবাজার) নং ট্রেনের ২৯১৬ নং ইঞ্জিনের ওয়াটার লিকেজ-জনিত কারণে ট্রেন দুটির যাত্রা বাতিল করা হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো. আমিনুল হাসান বণিক বার্তাকে জানান, রেলওয়ের মিটার গেজ ইঞ্জিনের স্বল্পতা রয়েছে। সংকট কাটাতে মেরামতের পাশাপাশি আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একটি রেলপথ সংস্কার প্রকল্পের অধীনে ৩০টির মতো লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা হবে। এসব ইঞ্জিন আমদানি হলে সংকট কেটে যাবে। তবে দীর্ঘদিনের পুরনো ইঞ্জিনগুলোর স্থায়ী মেরামতের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উদ্যোগটি সফল হলে চলতি বছরের মধ্যে মিটার গেজ ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা বাড়বে।

আরও