রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের বিশাল যুবশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘দেশের জনসংখ্যার কাঠামোতে সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে যুবসমাজ। এটিকে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। এটি দেশের জন্য একটি বড় সম্পদ ও সুযোগ। এ বিশাল যুবশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে নিঃসন্দেহে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে।’
তিনি গতকাল জাতীয় যুব দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ম্পর্কিত
স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবুল খায়ের ভূঁইয়া এবং মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান।
এর আগে রাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে বিভিন্ন স্টল ও যুবমেলা পরিদর্শন করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো স্বল্পোন্নত দেশ। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার কথা। এজন্য প্রস্তুতির সময় আরো তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যাতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে দেশের যুবসমাজ। তারাই ভবিষ্যতের প্রধান চালিকাশক্তি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্বও তাদের হাতেই।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে যুবসমাজকে কর্মমুখী করতে হবে। তাদের হাতে উৎপাদনের চালিকাশক্তি তুলে দিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়, একই সঙ্গে দেশকে নির্মাণও করতে হয়।’
এ সময় রাষ্ট্রপতি যুব উন্নয়নে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিভিন্ন অবদান ও কার্যক্রমের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
দেশ ও যুবসমাজের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘যুবকদের সামনে নিয়ে আসতে হবে। দেশ গঠনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় যুবসমাজকে সবক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করতে হবে। দেশের উন্নয়ন এবং যুবসমাজের ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা রাখা যাবে না।’
রাষ্ট্রপতি নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমাদের তরুণ-তরুণীরা এত ভালো কাজ করছেন, দেখে অত্যন্ত আনন্দিত ও উৎসাহিত হয়েছি। তারা খুব স্বল্প পুঁজি নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও নিজেদের পণ্য উৎপাদন করছেন। দেশের বাজারের পাশাপাশি রফতানির ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করছেন।’
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। একজন নারী উদ্যোক্তা দেশীয় খাবার ও মিষ্টি তৈরি করে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন। নিজের পরিবারকে সহযোগিতার পাশাপাশি তার পণ্য বিদেশে রফতানির উদ্যোগ নিয়েছেন।’ এ ধরনের সাফল্য উৎসাহব্যঞ্জক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় তিনি যুব সমাজকে শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে স্বনির্ভর ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতার জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করার কথাও বলেন।
তিনি আরো বলেন, ‘যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম রয়েছে। প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ঋণ সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব উদ্যোগকে আরো কার্যকর ও বিস্তৃত করতে হবে। প্রশিক্ষণ, ঋণ এবং অন্যান্য সহায়তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে বেকারত্ব কমানো এবং আত্মনির্ভরশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সুযোগ পেলে একজন মানুষ নিজের অবস্থার পরিবর্তন করে অন্যদের জন্যও সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেন। আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এ ধরনের সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা, তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য ন্যূনতম মূলধনের ব্যবস্থা করা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের যথাযথভাবে সহযোগিতা করা গেলে তারা নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে।’
একই সঙ্গে তিনি দেশের যুব সমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
যুব সমাজকে মাদকাসক্তি থেকে বেঁচে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের যুবসমাজের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে মাদকাসক্তি। তরুণদের মধ্যে মাদকের আসক্তি যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। এ আসক্তি বন্ধ করতে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা সৃষ্টি, প্রচারণা এবং কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ।’
রাষ্ট্রপতি এ সময় নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক, বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যসহ সব সামাজিক অনিয়মের বিরুদ্ধে যুবসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এসব সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুব সমাজের আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। নিজেদের উদ্যোগে এবং প্রতিটি অঞ্চলে সংগঠন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে, যাতে সমাজকে নষ্ট করে এমন সব নেতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা যায়।’
দেশে বায়োগ্যাস উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘বায়োগ্যাস প্রকল্পের ধারণাটি অনেক পুরনো হলেও এটি অত্যন্ত কার্যকর ও উপযোগী। বর্তমানে আমরা যে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি, বায়োগ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো গেলে সেই চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। এ ধরনের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্প সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।’
জাতীয় যুব পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আপনাদের এ অর্জন ও সাফল্য দেশের অন্য তরুণ-তরুণী ও যুবকদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’
বক্তব্য শেষে রাষ্ট্রপতি জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী জব ফেয়ার এবং দেশব্যাপী স্থাপিত বায়োগ্যাস প্লান্টগুলোর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এর আগে তিনি জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে যুব পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন।