কুড়িগ্রামের কালজানি নদীর ভাঙনে ১৫ দিনে বিলীন শতাধিক বসতভিটা

বর্ষা শুরুর আগেই কালজানি নদীর ভাঙনে দিশাহারা নদীপারের মানুষ।

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় গত দুই সপ্তাহে শতাধিক বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে আরো অর্ধশতাধিক পরিবার, ফসলি জমি ও অসংখ্য গাছপালা। অনেক পরিবার এখন বসতঘর সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে কালজানি নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ভিটামাটি হারিয়ে কেউ খোলা আকাশের নিচে, আবার কেউ স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রতিদিন নদীর গর্জন আর ভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটছে উত্তর ও দক্ষিণ ধলডাঙ্গার মানুষের।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিলখুড়ি ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন উত্তর ও দক্ষিণ ধলডাঙ্গা এলাকায় কালজানি নদীর তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার।

এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে উত্তর ধলডাঙ্গার প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গার প্রায় ১ হাজার ৬০ মিটার এলাকাজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর তীব্র স্রোতে মুহূর্তেই বসতঘর, গাছপালা ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা এলাকার তোফাজ্জল মিয়া (৫৫) বলেন, ‘এর আগেও কয়েকবার নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছি। কষ্ট করে আবার ঘর তুলেছিলাম। এখন আবার বাড়িঘর ভাঙনের মুখে। এবার বাড়িঘর ভেঙে গেলে কোথায় থাকব? স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, সেই চিন্তায় আছি।’

শিলখুড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন জানান, গত এক বছরে কালজানি নদীর ভাঙনে প্রায় এক হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে এলাকার ঐতিহ্যবাহী উত্তর ধলডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় ও বউবাজারও নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে।

ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা ময়েন উদ্দিন, সাহেজ উদ্দিন, মনির হোসেন, আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুল জলিল, হাফিজুর রহমান ও সুরমান আলী জানান, কয়েক দিনের ভাঙনেই বহু পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে। কেউ ঘর সরিয়ে নিতে পেরেছেন, আবার অনেকেই চোখের সামনে বসতভিটা নদীতে তলিয়ে যেতে দেখেছেন। তাদের ভাষায়, প্রতিদিনই নদী আমাদের গিলে খাচ্ছে।

৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনসার আলী জানান, প্রতিদিন অসহায় মানুষ সহায়তার আবেদন নিয়ে তার কাছে আসছেন। কেউ খাবার চাইছেন, কেউ আশ্রয়, আবার কেউ দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখতে গত শনিবার বিকালে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ। এ সময় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

ভিটামাটি হারানোর শঙ্কায় থাকা আনোয়ারা বেগম ও আকলিমা বেগম বলেন, ‘এক পাশে নদী, অন্য পাশে ভারতীয় সীমান্ত। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাব।’ ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্বস্ত করে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘নদীভাঙন রোধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। দ্রুত বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে।’ তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে দুই হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘প্রথম ধাপে দুই হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিরিক্ত জিও ব্যাগও সরবরাহ করা হবে।’ এদিকে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু। তিনি বলেন, ‘নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।’

আরও