ব্যবসায়ী নেতাদের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস

শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি আজ থেকে

বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে।’

শিল্পে গ্যাস সরবরাহ আজ থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী নেতাদের ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সবাইকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি থেকে বিরত থেকে সরকারের মেয়াদে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গতকাল ব্যবসায়ী নেতা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। ৩ ঘণ্টার এ আলোচনায় তারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। এছাড়া সভায় ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন) পেশ করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য জানান।

সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যা’ উল্লেখ করে বলেন, ‘এ সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।’ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।’

বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামীকাল সন্ধ্যা থেকে গ্যাস সরবরাহ এক-দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে।’ ঘাটতি মোকাবেলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জিটুজি ভিত্তিতে গত এক মাসে আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুতই কাজ শুরু হবে।’

সরকার ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তারেক রহমান। বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা দীর্ঘদিনের জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করেছে, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছে এবং সেগুলো সমাধানে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন তা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।’ যেকোনো কিছু পরিকল্পনা এবং সেটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি ও বিদ্যুতের এ সমস্যা চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়।’

সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায়, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও সভায় ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।’

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছার যে লক্ষ্য নেয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সে লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।’

হতাশ হওয়ার কারণ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সমস্যার ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আগে থেকেই অবগত। সরকার সমস্যাগুলো আড়াল না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে কীভাবে সেগুলোর সমাধান করতে চায়, সেটিও জানিয়েছে। আপনাদের জানাতে চাই যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সেজন্য হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।’ সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এগুলো বাস্তবায়ন হলে শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নয়; পুরো দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।’

দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘জনগণই সময়মতো ঠিক করবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। তবে যে সময় যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ দেয়া উচিত।’

আলোচনায় গণমাধ্যমকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘বড় কোনো কাজ সফলভাবে করতে একটি কার্যকর দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।’ ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরো ভালো কিছু করতে পারি।’

সভায় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ ও জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হকের নেতৃত্বে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসর্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএপিএ) সভাপতি মাহবুব এনাম, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির (বিএপিআই) সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ), বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলাম, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসি বাংলাদেশ) সভাপতি মাহবুবুর রহমান, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকার (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি. রহমানসহ আরো অনেকে।

এছাড়া দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, মোস্তাফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন, তরিকুল ইসলাম সৌরভ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মঙ্গলবার রাত থেকেই আমাদের নতুন করে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এর আগের যে অবস্থায় আমরা ছিলাম, গ্যাস-বিদ্যুতের ওই অবস্থায় ফিরে যেতে পারব। এটা আজ অনুষ্ঠিত বৈঠকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর।’

‘আগের অবস্থা’ বলতে কোন সময়ের পরিস্থিতি বোঝানো হয়েছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক বলেন, ‘আগস্টে যে সংকট ঘনীভূত হয়েছে, তার আগের অবস্থায়।’

ফজলুল হক বলেন, ‘শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের লোকজনই জ্বালানি সংকটে কমবেশি ভুগছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামীকাল রাত থেকেই গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহপ্রবাহ এর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব।’

এর আগে বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরে ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্‌দী আমিন। তিনি বলেন, ‘আজ এ অভূতপূর্ব আয়োজনের মাধ্যমে মূলত ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পায়নের জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি রয়েছে, বিশেষভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

মাহ্‌দী আমিন বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় পাঁচটি টার্মিনাল নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত সংকট দ্রুতই সমাধান সম্ভব নয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কয়লা থেকে একটা সমন্বিত উৎপাদনমুখী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, যেখানে আমাদের বিদ্যুতের স্বনির্ভরতা থাকবে। পাশাপাশি বিশেষভাবে সৌরশক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। সামনের দিনগুলোতে আমাদের বিদ্যুৎ খাত বৈচিত্র্যময় হবে এবং আমরা জ্বালানি সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব।’

আরও