চলতি বছর দেশে বোরো ধানের ফলন ভালো হলেও গত জুন থেকে বাড়তে শুরু করে চালের দাম। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোটা, মাঝারি ও সরু চালের দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছিল প্রায় ৮-১০ টাকা। তবে আগস্টের শেষদিক থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ দাম প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এক সপ্তাহে প্রতি কেজি চালের দাম কমেছে ৫-৬ টাকা। বিশেষ করে পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি দাম কমেছে ১২৫-১৫০ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত আমদানির কারণেই দাম কমতে শুরু করেছে। তবে পোলাও চালের দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি ৫০০ টাকা।
গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে চালের সরবরাহ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, ইরি, স্বর্ণাজাতীয় মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫২ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও এ চালের দাম ছিল ৫৫-৬০ টাকা। আটাশ, পাইজাম জাতীয় মাঝারি মানের চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকায়, মানভেদে এ ধরনের চালের সর্বোচ্চ দাম ৭০ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও মাঝারি মানের চাল ৭০-৭৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া নাজিরশাইল জাতীয় সরু চালের দাম কমেছে প্রায় ৭ টাকা পর্যন্ত। সরু চালের মধ্যে ভালো মানের নাজিরশাইল ৮০ টাকা এবং নিম্ন মানের চাল ৭২-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চালের দাম কমার অন্যতম কারণ আমদানি ও অভ্যন্তরীণ মজুদ। আমদানির চাল বাজারে আসার ফলে পাইকারি বাজারে দাম কমছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) জুলাই থেকে সর্বশেষ ২২ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪৩০ টন। এর মধ্যে সরকারিভাবে প্রায় ৫০ হাজার ৪৩০ টন এবং বেসরকারিভাবে ৩ লাখ ৩৪ হাজার টন আমদানি করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৯ লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। চাল ছাড়াও সরকার প্রায় ১১ লাখ ২৮ টন গম আমদানি করেছে।
সরকারের আমদানীকৃত চাল আসছে ভারত, মিয়ানমার ও দুবাই থেকে। ২২ অক্টোবর আরো এক লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে ৫০ হাজার টন আতপ চাল এবং দুবাই থেকে ৫০ হাজার টন নন-বাসমতী সেদ্ধ চাল আমদানি করা হবে। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ও জিটুজি ভিত্তিতে এ চাল আমদানি করা হবে। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৪৬ কোটি ২৩ লাখ ৮ হাজার টাকা।
এদিকে চলতি বছরে বোরো মৌসুমে দেশের কৃষক থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান কিনেছে সরকার। যার পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪২ টন। এছাড়া ৪৯ টাকা কেজি দরে সেদ্ধ চাল কিনেছে প্রায় ১৪ হাজার টন এবং আতপ চাল কিনেছে ৫১ হাজার ৩০৭ টন। যার কেজিপ্রতি মূল্য ৪৮ টাকা। বতর্মানে সরকারের খাদ্যভাণ্ডারে চাল মজুদ রয়েছে ১৪ লাখ ১ হাজার ৪৪৬ টন এবং ধান রয়েছে ২ হাজার ৫৬৬ টন।
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সর্বশেষ প্রকাশিত আপডেটে বলা হয়েছে, চালের দাম কিছুটা কমায় খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তি এসেছে। আগস্টে যেখানে চালের অবদান ছিল ৪৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা কমে ৪৫ শতাংশে নেমেছে। সেপ্টেম্বরে সব ধরনের চালের দাম গড়ে প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই থেকে সরকার চাল আমদানি করলেও আমদানীকৃত এসব চাল বাজারে আসছে সপ্তাহখানেক ধরে। এবার আমদানির পরিমাণ দৈনিক ভিত্তিতে বাড়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, যার প্রভাবে দাম কমেছে। রাজধানীতে কিছু বাজারে চালের দাম কমলেও সব বাজারে সমান নয় বলে মনে করেন তারা। এর অন্যতম কারণ স্থানীয় উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ও মজুদ সংগ্রহের কারণে সব বাজারে দাম সমানভাবে কমেনি।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আওয়াল তালুকদার বলেন, ‘কয়েক মাস পর চালের দাম কমতে শুরু করেছে। সপ্তাহখানেক ধরে ৫-৬ টাকা কমেছে। মিল মালিকদের সিন্ডিকেট করার ক্ষমতা এখন আর নেই। মিনিকেট, নাজিরশাইলের মতো চালের দাম প্রায় ৭ টাকা পর্যন্ত কমেছে। যে চাল ৮২ টাকা পর্যন্ত ছিল সেটা এখন ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মিনিকেট, নাজিরশাইলের মানভেদে দামের পার্থক্য আছে। আমদানি যদি সচল থাকে আমন মৌসুম এলে চালের দাম আরো কমতে পারে।’
এদিকে দাম কমলেও এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে বলে মনে করেন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, ‘এমনিতে বৈশ্বিকভাবেও চালের দাম নিম্নমুখী। সরকার আমদানি করায় দাম কিছুটা কমছে। ভবিষ্যতে যাতে দাম না বাড়ে এ বিষয়ে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।’
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বছরের মাঝখানে চালের দাম বাড়ায় সরকার অভ্যন্তরীণ ও আমদানির দিকে দ্রুত নজর দেয়। চাল কিনতে অভ্যন্তরীণ খাতের জন্য ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং আমদানি করতে ৭ হাজার ৮ কোটি টাকার বাজেট রয়েছে। তবে এটি সরকার প্রয়োজন অনুসারে বাড়াতে-কমাতে পারে। এখন চালের দাম কমার কারণ হচ্ছে খাদ্যবান্ধব উদ্যোগ নেয়া। যেহেতু বাজারে সরকারের মজুদের চাল ঢুকছে এখন আর কারো ম্যানিপুলেশন করার সুযোগ নেই। আমাদেরও সেটি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বা উদ্বৃত্ত সরবরাহ থাকলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে পারেন না। আমন মৌসুমে ভালো ফলন হলে দাম আরো কমবে।’
এদিকে চালের দামের সঙ্গে সঙ্গে কমেছে অধিকাংশ সবজি ও মাছের দাম। তবে অপরিবর্তিত রয়েছে মুরগি, ডিম ও পেঁয়াজের দাম। সবজির মধ্যে বরবটি, ঝিঙ্গা, করলা, ঢেঁড়স, কচুর লতি, চিচিঙ্গা, লাউ, পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়। তবে বেগুন ৮০ টাকা, টমেটো ১০০, শিম ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শীতকালীন সবজির মধ্যে শিম ১০০ টাকা, কপি ৪০ ও মুলা ২৫ টাকা।
মাছের দামও কমেছে। কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, রুই, কাতলা, মৃগেল ৩২০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০-২৩০ টাকা, কোরাল ৮০০ টাকা এবং চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগি ১৭৫ টাকা ও সোনালি মুরগি ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।