পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সিরাজগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে কমছে নিবাসীর সংখ্যা। ২০০৯ সালে শিশু নিবাসীর সংখ্যা ছিল ১৭৫। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩২ জনে। তবে নিবাসী বেড়েছে বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত এতিমখানায়। ১০ বছর আগে জেলায় ৩০টি এতিমখানায় নিবাসী ছিল ১ হাজার ৬০০ জন। এখন ৫০টি এতিমখানায় নিবাসী রয়েছে প্রায় তিন হাজার।
কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। শিশু পরিবারে সন্তানকে দিলে অনেকে মনে করে সমাজের কাছে ছোট হয়ে যাবে। এমন চিন্তা থেকে সন্তানদের এখানে দিতে চায় না। অন্যদিকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহের কারণে বেসরকারি এতিমখানায় নিবাসীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। সরকারি শিশু পরিবারে নিবাসী বাড়াতে লেখাপড়াসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে ২০০৯ সালে শিশু নিবাসী ছিল ১৭৫। ২০১৮ সালে কমে দাঁড়ায় ৮৭ জনে। ২০২১ সালে নিবাসীর সংখ্যা কমে হয় ৪৫ জন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩২ জনে। যদিও সরকার থেকে নিবাসীদের বিনামূল্যে পোশাক, খাওয়া, থাকার ব্যবস্থা, শিক্ষার সুযোগসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ১০ বছর আগে জেলায় ৩০টি এতিমখানায় নিবাসী ছিল ১ হাজার ৬০০ জন। এর মধ্যে ৩০০ জনকে প্রতি মাসে সরকারিভাবে ২ হাজার করে টাকা দেয়া হতো। এখন জেলায় বেসরকারি এতিমখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০টিতে। এসব এতিমখানায় নিবাসী রয়েছে প্রায় তিন হাজার। বেসরকারি এসব এতিমখানার ৯৮২ নিবাসীকে প্রতি মাসে সরকারিভাবে ২ হাজার করে টাকা দেয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সমাজে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে। সরকারি শিশু পরিবারে সন্তানকে দিলে টাকা পাওয়া যায় না। এ কারণে অনেকে তার সন্তানকে দিয়ে কাজ করিয়ে সংসারের খরচ চালান। এছাড়া আমাদের দেশের মানুষ অনেকটা ধর্মভীরু। ধর্মীয় চিন্তা থেকেই সন্তানদের বেসরকারি এতিমখানায় দিচ্ছেন অভিভাবকরা। যদিও বাংলা, ইংরেজি ও অন্যান্য পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে আরবি শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে সরকারি শিশু পরিবারে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বামীহারা নারী ও অনাথ শিশুদের পুনর্বাসনে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় পুনর্বাসন কেন্দ্র। ১৯৮৪ সালে সেটিকে শিশু সদনে রূপান্তর করা হয়। ১৯৮৮ সালে শিশু সদনকে সরকারি শিশু পরিবারে রূপান্তর করা হয়। সিরাজগঞ্জের রায়পুরে সরকারি শিশু পরিবার (বালক) প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৫৯ সালে। শিশু পরিবারে রূপান্তর করা হয় ১৯৯৯ সালের ১৯ আগস্ট। এখানে নিবাসীদের জন্য আসন সংখ্যা রয়েছে ১৭৫টি। এর মধ্যে শিশু নিবাসীদের জন্য অনুমোদিত আসন ১৬৫ এবং প্রবীণ নিবাসীদের জন্য আসন রয়েছে ১০টি। খাদ্য, আনুষঙ্গিক ও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রসাধনী ও বিবিধসহ প্রতি মাসে মাথাপিছু সরকারি বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার টাকা। সরকারি শিশু পরিবারে পিতৃহীন শিশু ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের ছয়-নয় বছর বয়সী সন্তানদের ভর্তি করা হয়। শিশু শ্রেণী থেকে বয়স অনুযায়ী শিক্ষার ব্যবস্থা, প্রয়োজনে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা, তিন বেলা খাওয়া, বছরে একবার পোশাক দেয়া হয়। প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে বিশেষ দিনে বিশেষ ধরনের খাবারও দেয়া হয় শিশুদের।
এছাড়া সিরাজগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে উপ-তত্ত্বাবধায়ক, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক, সহকারী শিক্ষক, অফিস সহকারী, বড় ভাইয়া, দুজন বাবুর্চিসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
এ ব্যাপারে সরকারি শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক হাসান শরিফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। শিশু পরিবারে সন্তানকে দিলে অনেকে মনে করেন, সমাজের কাছে ছোট হয়ে যাবে। এমন চিন্তা থেকে অনেকে তাদের সন্তানকে এখানে দিতে চায় না। এছাড়া অভাব-অনটনের কারণে সন্তানকে দিয়ে অনেকেই কাজ করান। সরকারি শিশু পরিবারে নিবাসী কমে যাওয়ার এটা একটা বড় কারণ। তার পরও নিবাসী বাড়াতে লেখাপড়াসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’