অর্থনীতির জায়গায় ধারাবাহিকতা না থাকলে শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপন্ন হয় দেশ

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য ড. রুবানা হক। মোহাম্মদী গ্রুপের এ চেয়ারপারসন পালন করেছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্বও। অন্তর্দৃষ্টির এবারের বিশেষ ঈদ আয়োজনে ফুটে উঠেছে তার কবিসত্তা, ব্যবসায়িক জীবনের চ্যালেঞ্জ, ঈদের স্মৃতিসহ নানা বিষয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বদরুল আলম

আমরা জানি আপনার একটা ভিন্ন পরিচয় আছে। আপনি একজন কবি। এ কবিসত্তাকে আপনি কীভাবে খুঁজে পেলেন? লালন করছেন কীভাবে?

খুব ইন্টারেস্টিং। কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম যখন আমার বয়স ৪০ বছর। আমার মনে আছে প্রথম কবিতাটি লেখার সময় খুব মনঃকষ্টে ছিলাম। যেহেতু দুঃখ নিয়ে আত্মরতি করা আমার স্বভাববিরুদ্ধ, সেজন্য কবিতাটাও বোধহয় মাঝে মাঝে ভুলে যাই। মানে আদৌ যে কখনো কবিতা লিখেছি...। প্রথমত ভীষণ লজ্জাবোধ করি। কখনো পুরনো কবিতা পড়লে মনে হয়, কীভাবে এ ছাইপাশ লিখলাম। আর এখন একেবারেই লেখা হয় না। আমি কালকে (২২ মার্চ) এ ঈদ নিয়ে একটু কষ্টের কথা লেখার চেষ্টা করছিলাম। তো এটা মানে পদ্য লিখতে গিয়ে গদ্য হয়ে গেছে। তখন বুঝলাম যে আসলে পদ্যের দিন শেষ। এখন বোধহয় শুধুই গতানুগতিক গদ্যের সময়। কিন্তু এখনো ৬০টার মতো কবিতা তৈরি (রেডি), খুব সাহস করে মাঝে মাঝে আগাই। এক পা আগাই, দুই পা পেছাই, আর ভাবি যে কবিতাগুলো প্রকাশনার জন্য প্রস্তুতি নেব কিনা। খুব ভয় লাগে কারণ যে কবিতা আজকে ভালো লাগে, সেটা কালকে গিয়ে দেখি একদম যা-তা।

আপনি একসময় টেলিভিশনে উপস্থাপনা করতেন। শৈশব থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, সেই যে বেড়ে ওঠা, গড়ে ওঠা, সেই সময়টা, সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে?

একদম সবকিছু ভুলে গেলেও ওগুলো মনে থাকে, কারণ ওটা একটা রঙিন স্বপ্নের সময় ছিল। তখন মনে হতো সাংবাদিকতা করব। সত্যি কথা বলব। তখন মনে হতো জোরে কথা বললে বোধ হয় সবাই শুনবে। আস্তে আস্তে স্বপ্নগুলো ধূসর হয়ে গেছে। সাংবাদিকতাই বলেন অথবা...। মানে আমি কখনই চিন্তা করিনি যে আমি ব্যবসায়ী হব, কখনই ভাবিনি। সবসময় মনে হয়েছে যে আমি পড়াশোনা করব। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো ছিলাম। পড়াশোনা করব, একজন একাডেমিক হব। মানে এই যে ব্যবসা জগতে ঢুকব, একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। কাজেই প্রায় কাকতালীয়ভাবেই আমার এ ব্যবসার জগতে প্রবেশ। সেই সময়কারটার কথা যদি বলি, তখন আমরা অনেকে একসঙ্গে ছিলাম। শৈশবে টেলিভিশন শুরু করেছি সেই ডিআইটি থেকে। ডিআইটিতে ‘এসো গান শিখি’ হতো। ‘নতুন কুঁড়ি’তে আমার মনে আছে আমি উচ্চাঙ্গ সংগীতে পুরস্কার পাই মহা আনন্দ, বৃন্দাবনী সারাং (রাগ) গেয়ে। তারপর ফেরদৌসী রহমান, তাকে ময়না বলতাম আমরা। ময়নার ‘এসো গান শিখি’ প্রোগ্রামে আমরা অংশ নিই। তারপর আস্তে আস্তে… কখনই টেলিভিশন ছাড়া হইনি। বিতর্ক করেছি প্রচুর। কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে প্রচুর বিতর্ক করেছি। সেই সুবাদেও টেলিভিশনে ফেরত যেতে হয়েছে। মঞ্চে অভিনয় করেছি বোধ হয় ‘যায় যায় জনতা’ বলে একটা নাটকে, সেটাও মনে আছে। অনেক কিছু ভুলে গেছি কিন্তু ওগুলো ভুলিনি। পরের দিকে গিয়ে ফজলে লোহানীর একটা অনুষ্ঠান হতো ‘যদি কিছু মনে না করেন’, সেটা করতাম। সেটাও খুব ইন্টারেস্টিং ছিল, ওই মানুষটার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল। তারপর অবশ্য আমার একটি অনুষ্ঠানের জন্য প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া তখন ছিল। কারণ আজকাল যে রকম কোনো অনুষ্ঠান করলে আমরা গিয়ে সম্পাদনা (এডিট) করি। নিজেরা রীতিমতো এডিট প্যানেলে বসে দেখি কী বাদ গেল কী বাদ গেল না, তখন সেই সুযোগটা ছিল না। কাজেই এডিট প্যানেলটা একটু একপেশে ছিল, যার কারণে ওটা আমার খুব কষ্টের একটা সময় গেছে। কিন্তু সারাজীবন যুদ্ধ করেছি তো, যুদ্ধ করতে করতে কোথায় যেন বড় বড় পাহাড় পেরিয়ে গেছি। এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি যেখানে আর পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়াটা খুব অপ্রত্যাশিত কিছু নয় আমার কাছে। কাজেই আমি সবসময় সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকি।

আগের দিনের ঈদ এবং বর্তমানের ঈদ, একটা পরিবর্তন তো লক্ষ করেছেন। পরিবর্তনগুলোকে কীভাবে দেখছেন?

যখন ছোট ছিলাম তখন ঈদ মানেই হলো নতুন জুতো, নতুন কাপড়। আমার এখনো মনে আছে আমার সবুজ আর গোলাপি একটা জুতো ছিল। ওটা মাথার নিচে নিয়ে প্রথম মানে যখন খুব নেশা হলো যে না নতুন পেতেই হবে জুতো, তখন ওইভাবে ঘুমিয়েছিলাম সারা রাত মাথার নিচে নিয়ে। ঈদ তখন ছিল সালামির ঈদ, উপহারের ঈদ, নতুন কাপড়-জুতোর ঈদ। যখন নিজের সংসার হলো, তখন সকালে কোনোমতে নাশতা করে ভাবতাম যে রেস্ট করি। আর কোথাও যেতে ইচ্ছা করত না। তার পরও মুরব্বিদের কাছে যেতে হবে, যাব, সালাম করতে হবে, করব। আর এখন এসে ঈদ একেবারেই ভিন্ন। এখন ঈদ আসলে স্মৃতিচারণ। আগের দিনের সেই সেমাই খাওয়া, যেটা প্রত্যেক বছরই হয়। কিন্তু ওই যে সালামি, পায়ে ধরে সালাম করা কিন্তু আমাদের আর ঐতিহ্যে বা চর্চায় (ট্র্যাডিশন) নেই। সবাই বলে যে মাথা নিচু করবে না, ইসলাম এ শিক্ষা তোমাকে দেয় না। কিন্তু তার পরও ওই যে পা-টা ধরে, তারপর বলতাম যে আচ্ছা মাথা উঠিয়ে সালাম করো, তাও সালামটা করো। সেই জায়গাটায় আমরা সালামি দেয়াটাও আসলে ভুলে গেছি।

আজকাল তো সালামিও ডিজিটাল উপায়ে দেয়া হচ্ছে...

এইটায় অবশ্য আমি এখনো যাইনি। তবে আমি অনেক চেষ্টা করেছি, ব্যাগের মধ্যে টাকা নিয়ে ঘুরছি, যে-ই সালাম করবে তাকে দেব বলে। শেষ পর্যন্ত দেখি কেউই সালাম করে না। তারপর ডেকে ডেকে আমাদের বাড়িতে যারা কাজ করেন সবাইকে, যেই বাড়িতে যাচ্ছি ওদেরকে দিচ্ছি। তখন আমার মনে হয়েছে যে আসলে এখন আর কেউ সালামির প্রত্যাশা করে না (অ্যাকচুয়ালি নোবডি নিডস সালামি অ্যানিমোর)। মানুষ ভুলে গেছে আসলে। বোধটা নেই, ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছি আমরা। অনেকগুলো প্রথা ভুলে গেছি এবং এটার জন্য আমরাই দায়ী। কিন্তু এবার ঈদে আমি সুচিন্তিতভাবে বা সেধেই আমার সব মুরব্বির কাছে যাচ্ছি। প্রত্যেককে পায়ে ধরে সালাম করছি। কারণ ওনারাও যাতে বোধ করেন যে আমরা ভুলিনি। আমি আশা করছি যে আমাদের পরের প্রজন্মও ভুলবে না এবং ঈদ ওদের জন্য যথেষ্ট জরুরি থাকবে। শুধু বিদেশে যাওয়া না, বিদেশে গিয়ে ঈদ করা বা যেকোনো ছুটিতেই বাইরে চলে যাওয়া না। আশা করি যে দেশের মধ্যে থেকে আমরা যদি সবাই মিলে উৎসবমুখর না হই, তাহলে বোধ হয় এ উৎসবগুলোই আসলে অর্থহীন হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন। আপনি যেখানকার উপাচার্য। ঈদ উপলক্ষে নিশ্চয়ই সেখানকার অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি যান না। আপনাদের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো বিশেষ আয়োজন থাকে?

সবসময় থাকে। আমাদের শুধু ঈদ না, যেকোনো রকম উপলক্ষে সারাক্ষণই ইউনিভার্সিটিতে উৎসব চলতে থাকে। আমরা আসলে বোধহয় অজুহাত খুঁজি, উৎসবের অজুহাত, সেটাও অনেক আনন্দের। কাজেই শুধু ইসলাম না, আর বাকি যত ধর্ম আছে প্রত্যেকটা ধর্মের যত অনুষ্ঠান, যে পার্বণ আছে, প্রত্যেকটা পূজা-পার্বণের সবগুলো আমরা উদযাপন করি।

আমরা একটু পোশাক খাত নিয়ে কথা বলি। বাংলাদেশের পোশাক খাত একটা শক্তিশালী ঐতিহ্যের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও এখনো পণ্য ও বাজার বিবেচনায় বৈচিত্র্যের অপার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে নতুন প্রজন্ম এ খাতে তেমন একটা আগ্রহী হচ্ছে না। এই যে নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, সেটাকে ফিরিয়ে এনে কীভাবে এ খাতকে টেকসই করা যায়?

খুব কঠিন প্রশ্ন এটা। কারণ আমার বাচ্চারা কিন্তু আছে এ ব্যবসায়। এটা ঠিক যে আমার বড় ছেলে সারাক্ষণ বলে যে আর পারছি না, আর পারছি না। আমিও এখন সময় দেয়া শুরু করেছি। ওদের কিছুটা ভার লাঘবের জন্যই। পোশাক শিল্পে যারা এসেছেন অথবা যারা ব্যবসাবিমুখ এখন, তাদের দোষ দিই না। কারণ আসলে নানাভাবে খাতটি অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। যদি সামনে বলি তাহলে একটা তো এলডিসি উত্তরণ, এটা আমাদের জন্য বিরাট একটা ব্যাপার। কিন্তু যদি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন স্থগিতও হয় বা বিলম্বিত হয়, তার পরও সামনের পথনকশাটা কী? আমরা যতই বলি যে আমাদের সহজ ও সাবলীল উত্তরণ কৌশল সব লেখা আছে। লেখা ঠিকই থাকে, কিন্তু করা হয় কি? কাজেই নীতিমালার কোনো ঠিক নেই, এটা হলো একটা। উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে বৈচিত্র্যায়ণ দরকার, কাঁচামাল ও সহায়ক শিল্পের জন্য আরো বেশি পশ্চাৎমুখী সংযোগ দরকার। করবে কে? এই যে একটা সবাই যে আমরা খুবই ক্যাজুয়ালি এখন অফিসে যাই। এই যে ম্যানমেড ফাইবারের (কৃত্রিম তন্তু) কাপড়গুলো পরি। ম্যানমেড ফাইবার তো আর এখানে হয় না। তাহলে এরপর কী হবে? আমরা কোনো আঞ্চলিক সহযোগিতায় যাব কিনা। আসলে কোনো রকম দিকনির্দেশনা নেই। খুবই সংগত কারণে আসলে আমাদের পরের প্রজন্ম তো সবাই শিক্ষিত বাচ্চা। আমরা না হয় কোনোমতে এসেছি। আমি মনে করি ওরা সবাই অত্যন্ত বিপাকে পড়েছে। কারণ ওরা আসলে ভাবছে যে এরপর কী হবে? আর নীতিনির্ধারণের জায়গাগুলো যেহেতু স্পষ্ট না, ওইভাবে কোনো থিংক ট্যাংক নেই যে পোশাক শিল্প নিয়েই ভাববে। অথবা শুধুই-বা পোশাক শিল্প নিয়ে ভাবব কেন আমরা? আমি জানি যে আমার সব কলিগ সবাই আমাকে গাল দেবে যে কেন এটা বলছ? কিন্তু বাংলাদেশে তো আসলে বৈচিত্র্যায়ণ দরকার। বাংলাদেশকে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা যে আগামী ৩০ বছর কী হবে, সেই চিন্তা কারো নেই। এ পরিকল্পনা না থাকার কারণেই কিন্তু আমাদের মনে হয় যে পরের প্রজন্ম অত্যন্ত ভীত। কারণ কেউ জানে না, অনেক কিছু অজানা। আমার মনে হয় যে এ অনিশ্চয়তাটাকে যদি দূর করতে হয় এবং পরের প্রজন্মকে যদি আসলেই উৎসাহিত করতে হয়, তাহলে আমাদের একটা সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার। মুশকিল হলো যিনি ক্ষমতায় আসেন বা যে সরকারে আসেন, অল্প সময়ের জন্য এবং তারপর যিনি আসবেন সেই ধারাবাহিকতা থাকে না। অর্থনীতির জায়গায় আসলে যদি ধারাবাহিকতা না থাকে তাহলে কিন্তু শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে বিপন্ন হয় দেশ। এ জায়গাটাকে আসলে একটু গুছিয়ে আনাটা খুব দরকার। গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খুব দরকার, যেটা হচ্ছে না। এ ডিজিটাল যুগে আসলে সবাই খুব তাড়াতাড়ি বড়লোক হতে চায়। কষ্ট করে ফ্যাক্টরিতে গিয়ে কে শুনবে সবাই চিৎকার করছে! শ্রমিকের কথা শুনতে হবে। ফ্যাক্টরি ম্যানেজারকে সামলাতে হবে। কে চায় এটা করতে? আমরা না হয় করে আসছি, এখনো করছি আমাদের সামাজিক বা দায়বদ্ধতা আছে বলে। পরের প্রজন্ম কেন করবে, যদি না এটি সত্যিই তৃপ্তিদায়ক হয়। আর এ তৃপ্তি বা সার্থকতার জায়গাটা তখনই হবে, যখন আমাদের নীতিমালাগুলো সাবলীল বা সহজসাধ্য হবে। সেটার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।

আপনি নিজে একটি গণমাধ্যমের নেপথ্যে রয়েছেন। এই যে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্লাটফর্ম আছে, এগুলোর কারণে আমাদের নিয়মিত গণমাধ্যমগুলো এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ খাতের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে, এ বাজারে আমাদের টিকে থাকা, দর্শকদের রুচি তৈরি করা, চাহিদার পরিবর্তন সামলানো, এ খাত নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ অন্তর্দৃষ্টি কী বলে?

আমার মন বলে যে আমার গোটা সময়টা আমার টেলিভিশন স্টেশনে কাটানো উচিত। কিন্তু আমি একদম যাই না। কেন যাই না? প্রথমত, খুব সহজে বলতে গেলে বলতে হয় যে আসলে দর্শকের রুচি আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারি না। অনেকে বাংলা ছবি দেখতে পছন্দ করেন। অনেকে গানের প্রোগ্রাম দেখতে পছন্দ করেন। অনেকে খবর দেখতে দেখতে, পড়তে পড়তে আর শুনতে শুনতে ক্লান্ত। কারণ নতুন কিছু তো নেই। যদি হঠাৎ করে নতুন কিছু বলা হয় বা প্রচার করা হয়, সেটারও একটা প্রতিক্রিয়া আছে। তো আমরা আসলে... আমি আসলে ভীতু মানুষ। আমি প্রতিক্রিয়াটাকে খুব ভয় পাই। ক্রিয়া ভয় পাই না, কিন্তু প্রতিক্রিয়া ভয় পাই। আমি সামাজিক মাধ্যমে একেবারেই নেই। আমার একটা খালি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট আছে, সেটাও আমার বাচ্চাদের জন্য, আর কারোর জন্যই না। আমার নানা সময় মনে হয়েছে যে আসলে একেবারেই খুলে কথা বলার মতো জায়গাটা বোধ হয় এখনো নেই বাংলাদেশে। কোনো দেশে আছে কিনা জানি না। তবে অন্তত এখনো কিছু আন্তর্জাতিক পত্রিকা আছে, যেগুলো এখনো পড়লে অন্তত স্বস্তিবোধ করি যে নিরপেক্ষ রিপোর্টিং হচ্ছে। কিন্তু এ জায়গাটায় সবাই জানি কেন আমরা একদিকে এক স্রোতের দিকে ধাবিত হতে থাকি। আসলে একটা তো আর স্রোত না। আমার মনে হয় এই যে বহুমুখিতা, এটা আমরা এখনো সেভাবে ধারণ করতে পারি না এ দেশে। সত্যি কথা বলি, যে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা, সেই জায়গাটাতেও আমরা কেন জানি খুব উগ্র। যাও-বা আমরা ভাবি যে আমরা খুবই উদার কিন্তু ভেতরে এত আমাদের কার্পণ্য, লজ্জাবোধ করি মাঝে মাঝে। নিজেরও অনেক পক্ষপাতিত্ব আছে। বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে যে রকম বাচ্চাদের ঠেলে গার্মেন্টসে আনা যায় না, ও রকম আমাদের মতো কিছু লোককে ঠেলে টেলিভিশন স্টেশনে বসানো যাবে না। কারণ গুলিয়ে যাব। সত্যি কথা না বলতে পারার যে কী কষ্ট এবং কিছুই কখনো বলতে পারব না, সেটাও কষ্টের। আমি একটি পত্রিকায় মাঝে সাঝে লিখতাম আগে, এখন একদম লিখি না। সেখানে আমি একটা স্যাটায়ার—মানে সত্যি কথা তো বলতে পারছি না সোজা করে, তাই ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে স্যাটায়ার একটা লিখে পাঠিয়েছি। আমাকে এ প্রথমবার ওই কলামের এডিটর বললেন যে এটা আসলে লিটারেচার পেজে (সাহিত্য পাতা) যাওয়া উচিত। মানে ওনারাও খুব শঙ্কাগ্রস্ত যে আমার এ লেখাটা ছাপলে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে বা কে কীভাবে নেবে। কাজেই রূপকও হবে না আবার সোজা কথাও বলতে পারব না। তার থেকে বলাও বন্ধ করা উচিত আর দেখাও বন্ধ করা উচিত।

বর্তমান বিশ্বের যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, সেখানে যে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশের ব্যবসায়িক মহলের টিকে থাকা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? আমাদের কৌশল কী হওয়া উচিত?

আমাদের কৌশল এখানে একদম ম্যাটার করবে না, তাই না? আমরা এমন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যে সময়টাকে আসলে বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই, কারণ এত অনিশ্চিত এ মুহূর্তে! নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে লিখেছে যে একজন ব্যক্তি প্রতিদিন গড়ে আটটা করে মিথ্যা কথা বলে। তা আপনি চিন্তা করে দেখেন এত মিথ্যার মধ্যে থেকে, এত ঝামেলার মধ্যে থেকে, পরবর্তী সময়ে কী হবে আমরা জানি না। এ ট্যারিফ নিয়ে দেখেন কত কিছু হলো, শেষ পর্যন্ত দেখেন ট্যারিফের...। আসলে আমরা খুব বেঁচে গেছি যে মানসিকভাবে আমরা এখনো অতটা সংকটে নেই। কারণ রোজার মধ্যে একটা ঈদ ঈদ অনুভূতি থাকে। এ রোজার মধ্য থেকে ঝামেলা শুরু হয়েছে, এখনো ঈদের আমেজে চলছে। যেই মুহূর্তে ফ্যাক্টরিগুলো খুলবে, সেই মুহূর্তে শিপমেন্টের প্রেশার। তখনই আমরা বুঝতে পারব যে আসলে কী হচ্ছে। এটা কিন্তু একেবারেই অশনিসংকেত আমাদের জন্য। আমরা ভেবেছিলাম যে দু-চারদিন চলবে, বড়জোর এক সপ্তাহ, এ তো সব ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং যতই দিন যাচ্ছে ততই মনে হচ্ছে যে বোধহয় আমরা সাংঘাতিক একটা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যাব। এখন পর্যন্ত ক্রেতারা কিছু বলছেন না। চুপ আছেন। কারণ তারাও ভাবছেন যে সব বদলে যাবে। কিন্তু এ সংকট যদি অতি শিগগির অন্তত আগামী ১০ দিনে শেষ না হয়, আমাদের জন্য সত্যিই অনেক দুঃসংবাদ হয়তোবা আসতে থাকবে। ক্যানসেলেশন (বাতিল) হতে থাকবে। এয়ার ফ্রেইট (আকাশপথে পণ্য পরিবহন) হতে থাকবে। এই হবে, আর কী করব?

আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় আপনার প্রয়াত জীবনসঙ্গী আনিসুল হকের সঙ্গে ঈদ নিয়ে কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?

আনিসের সঙ্গে ঈদ নিয়ে স্মৃতি কী মনে পড়বে? ঈদে সারাক্ষণ তো আনন্দমেলা করত। আমাদের ঈদে বেশির ভাগ সময় হতো ঈদের আগে খালি আনন্দমেলার প্রস্তুতি। আর ঈদের দিনে বসে আনন্দমেলা দেখা এবং কে কী গালাগালি করছে সেটার একটা হিসাব করা। আনিস আর আমার জীবনটা আসলে খুব সাধারণ ছিল। ওই সকালবেলা নামাজ পড়তে যাওয়া, ফেরত আসা। এসে ওই সেমাই খাওয়া, মুরব্বিদের সালাম করা। বাচ্চাদের নিয়ে থাকা, সন্ধ্যার সময় খুব বেশি হলে আমরা ওই টেলিভিশনের সামনে বসে সব ঈদের প্রোগ্রাম দেখতাম।

ওই সময় চ্যানেলও তো ছিল একটা।

আসলে ভোগবাদ আপনাকে অনেক মানসিক যন্ত্রণা দেয়। বণিক বার্তায় বসে এ কথাটা বলছি। কিন্তু আসলে বণিকরা আমাদেরকে নানা রকম দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে। কারণ কী কিনব, কোন চ্যানেল দেখব কোনটা দেখব না, সবই কেমন যেন ফ্যাকাশে (ফিকা) লাগে এখন। তখন তো সব রঙিন ছিল। তো যেই দিন গেছে সেটা রঙিন, সামনের দিনগুলো একটু ফ্যাকাশে, এটা এভাবেই চলবে।

আপনি একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন আপনি রাঁধতে জানেন না। ঈদে আপনার বাসায় তাহলে এ দায়িত্ব কার? কী খেতে পছন্দ করেন?

আমি সব খেতে পছন্দ করি। সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি ডিম আর কলা। যখন পরীক্ষা দিতে যেতাম মা একটা করে কলা আর দুটো করে ডিম খাওয়াত। কারণ ১০০—একটা ১ আর দুটো ০। তো ডিম আর কলা সবসময় পছন্দ করি। একদম রাঁধতে পারি না আজ পর্যন্ত। আমার বাচ্চারা বলে প্লিজ রাঁধো না, রাঁধলে আমরা মারা যাব। কিন্তু কেন যেন রেসিপি মোটামুটি পারি নিজে বানাতে। অত পারি না বাট জানি যে কোনটার সঙ্গে কোনটা যাবে। বাবুর্চি ভালো আছে, তাই বেঁচে গেছি। কিন্তু সত্যি আমি একদম রাঁধি না, পারি না। আমার মনে হয় ধৈর্য লাগে রাঁধতে, আমার ধৈর্য নেই। আমি ছবি আঁকতে পারি না, রাঁধতে পারি না। বাকিগুলো মোটামুটি পারি।

আপনাকে আবারো ধন্যবাদ।

খুব খুশি হয়েছি আসতে পেরে। ধন্যবাদ।

আরও