অনুমোদন ছাড়াই চলছে চুয়াডাঙ্গার ৮৫% ইটভাটা

উপরিভাগের মাটি পোড়ানোয় উৎপাদন সক্ষমতা হারাচ্ছে জমি

চুয়াডাঙ্গা অবৈধভাবে জমির উপরিভাগের মাটি এবং কাঠ পুড়িয়ে চলছে ইট উৎপাদনের মহাযজ্ঞ। জেলার ৯০টি ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে এসব মাটি আর কাঠ। অথচ এসব ইটাভাটার ৮৫ শতাংশেরই কোনো অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তর।

চুয়াডাঙ্গা অবৈধভাবে জমির উপরিভাগের মাটি এবং কাঠ পুড়িয়ে চলছে ইট উৎপাদনের মহাযজ্ঞ। জেলার ৯০টি ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে এসব মাটি আর কাঠ। অথচ এসব ইটাভাটার ৮৫ শতাংশেরই কোনো অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, একটি ইটভাটা বৈধভাবে চালু রাখতে হলে বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প কলকারখানা অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসকের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। কিন্তু জেলার ৭৫টিরও বেশি ইটভাটা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ছাড়পত্র না নিয়েই ইট তৈরির কাজ করছে।

এছাড়া ইট তৈরিতে মানা হচ্ছে না সরকারি নির্দেশনা। ইটভাটাগুলোয় স্থায়ী চিমনির বিকল্প হিসেবে টানেল চুলা, ইমপ্রুভড জিগজ্যাগ চুলা বা হাইব্রিড হফম্যান চুলাকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলা হলেও জেলার ইটভাটাগুলো চলছে সনাতন পদ্ধতিতে।

এদিকে ইটভাটায় ফসলি জমি ও জ্বালানি কাঠ ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু জেলার ৯০টি ইটভাটাতেই পোড়ানো হচ্ছে ফসলি জমির মাটি ও কাঠ। গ্রামীণ সড়ক দিয়ে ইট পরিবহনের নিষেধাজ্ঞাও মানা হচ্ছে না।

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, জেলার ৯০টি ইটভাটায় এক মৌসুমে ইট তৈরির জন্য পোড়ানো হয় তিন লাখ ঘনফুট মাটি। এসব মাটির অধিকাংশই আসছে কৃষকের ফসলি জমি থেকে। ফলে জমির উর্বরতা হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পাশাপাশি কয়লার পরিবর্তে এসব ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফলে পরিবেশ দূষণের কারণে ক্রমেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে স্থানীয় জনগণ।

এসবের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে অর্থদণ্ড করা ব্যতীত স্থানীয় প্রশাসনের আর তেমন কোনো পদক্ষেপও চোখে পড়ে না।

তবে ফসলি জামির মাটি অবৈধভাবে কাটার বিষয়টি মানতে নারাজ ইটভাটা মালিকরা। তারা বলছেন, মাটি সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদাররা কোথা থেকে মাটি সংগ্রহ করেন তা তাদের জানা জরুরি নয়।

বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব জানান, বৈধভাবে চালু রাখতে প্রত্যেকটি ইটভাটা মালিককে ভ্যাট দিতে হয় ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, বিএসটিআইকে ৬ লাখ টাকা, পরিবেশ অধিদপ্তরে নতুন ইটভাটা বাবদ ২৫ হাজার টাকা ও ভ্যাট ৩ হজার ৭৫০ টাকা, পুরনো ইটভাটা বাবাদ সাড়ে ১২ হাজার ও ভ্যাট ১ হাজার ৮৭৫ টাকা, শিল্প কলকারখানা অধিদপ্তরকে ৮ হাজার ৭৭৫ টাকা, ফায়ার সার্ভিসকে ১০ হাজার টাকা, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ১২ থেকে ৫০ হাজার টাকা ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পরিশোধ করতে হয় ৪৫ হাজার টাকা। জেলা প্রশাসনসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠানে ইট পোড়ানো মৌসুমে জেলার ইটভাটা মালিকদের বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয় ১ কোটি ৯৫ লাখ ২১ হাজার টাকা।

জেলার একটি ইটভাটা মালিক হাবিবুর রহমান লাভলু জানান, চার-পাঁচটি ইটভাটা বাদে সব ইটভাটায় উৎপাদিত ইট সঠিক মাপের নয়। আবার এসব ইটের দামও রাখা হচ্ছে বেশি।

জেলার বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, ইটভাটায় দেয়ার জন্য জমির মাটি কাটার কারণে প্রায় চার বছর ফসল ভালো হয়নি। বিভিন্ন সার প্রয়োগ করে জমি প্রস্তুত করতেই সময় চলে যায়। এ কারণে প্রচুর পরিমাণ লোকসানের সম্মুুখীন হতে হয় তাদের।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আলী হাসান বলেন, যেকোনো ফসলি জমির ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত ‘টপ সয়েল’। টপ সয়েল ফসল উৎপাদনের প্রধান উপাদান। এটা কেটে বিক্রি করে দিলে ওই জমির আর কিছুই থাকে না। মাটি কাটার এ ধরনের অরাজকতা ঠেকাতে না পারলে কয়েক বছর পরে এ জেলায় ফসল উৎপাদন দুষ্কর হয়ে পড়বে।

কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতাউর রহমান বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলায় ৮৫ শতাংশ ইটভাটায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। মাত্র পাঁচজন লোকবল নিয়ে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় কার্যক্রম চালু রাখতে হচ্ছে। ফলে অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অবৈধ ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

আরও