খাজা শাহরিয়ার। দায়িত্ব পালন করছেন আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান পদে। গত ৩ সেপ্টেম্বর তাকে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটির পুনর্গঠিত পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সব মিলিয়ে প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এ ব্যাংকার সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমামূল হাছান আদনান
সুশাসনের ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আপনাকে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার পর গত দুই মাসে কী কী উদ্যোগ নিলেন?
দেশে ইসলামী ধারার ১০টি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহৎ ব্যাংক হলো আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। তার মানে আগে থেকেই দেশে এ ব্যাংকের খুব ভালো একটি অবস্থান আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গঠন করে দেয়া পর্ষদে এখন আমরা পাঁচজন পরিচালক রয়েছি। দায়িত্ব নেয়ার পর এ দুই মাসে আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল করপোরেট সুশাসনকে সুদৃঢ় একটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেয়া। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল যথাযথ তারল্য ব্যবস্থাপনা। এ দুই ক্ষেত্রেই আমরা এখন পর্যন্ত সাফল্য পেয়েছি। আগে থেকেই এ ব্যাংকে মোটামুটি সুশাসন ছিল। সেটি এখন আরো বেশি জোরদার করা হয়েছে।
দেশের ব্যাংক খাতে আগে থেকেই তারল্য সংকট ছিল। এর মধ্যেও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল। কিন্তু গত তিন-চার মাসে এ ধারার ব্যাংকগুলো থেকে প্রচুর তারল্য বের হয়ে গেছে। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো একটি ধাক্কা খেয়েছে। ছয়টা ব্যাংকের তীব্র তারল্য সংকটের সংবাদ এ ধাক্কাকে আরো বেশি জোরালো করেছে। তবে এর মধ্যেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক সফলভাবে তারল্য ব্যবস্থাপনা করতে সামর্থ্য হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি, দৈনন্দিন লেনদেন পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখার। লেনদেন মেটাতে অন্য কোনো ব্যাংক থেকে আমাদের বিশেষ ধার নিতে হয়নি। এমন একটি ঘটনাও ঘটেনি, যে গ্রাহক এ ব্যাংকের শাখায় এসেছে, কিন্তু টাকা তুলতে পারেনি।
এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার কারণে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেয়ার পর এ ব্যাংকে গ্রুপটির ঋণ কত পেলেন?
এস আলম গ্রুপের কোনো ঋণ এ ব্যাংকে নেই। অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় এক্ষেত্রে আল-আরাফাহ্ ব্যতিক্রম। গ্রুপটির কোনো ঋণ না থাকাটি আমাদের জন্য স্বস্তির। অন্য ব্যাংকগুলো থেকে নামে-বেনামে ঋণ বের করে নেয়ার যেসব ঘটনা আমরা শুনছি, সে ধরনের কোনো বিষয় এ ব্যাংকে ঘটেনি।
তার মানে পরিচালনা পর্ষদে এস আলম গ্রুপের কর্তৃত্ব সত্ত্বেও আল-আরাফায় কোনো অপরাধ হয়নি! আর্থিক প্রতিবেদনে যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবেও সেটি আছে?
হ্যাঁ, এখানে গোপন কিছু নেই। বেনামি ঋণ দেয়ার মতো অপরাধ আল-আরাফাহ্তে ঘটেনি। তবে এটি ঠিক, পোর্টফোলিওতে কিছু দুশ্চিন্তার কারণ আছে, যা দেশের অন্য আট-দশটি ভালো ব্যাংকেও বিদ্যমান। আমরা এখন সেসব বিষয় নিয়েই কাজ করছি, ব্যাংকের ঋণ (বিনিয়োগ) আদায়ে জোর দিচ্ছি। সামগ্রিকভাবেই দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব আল-আরাফাহ্তেও পড়েছে। আমরা এখন আদায় বাড়িয়ে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে বেশি কিছু ঋণ আদায়ে আমরা সফল হয়েছি। আজকেও ১০০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে।
আল-আরাফাহ্তে এস আলম গ্রুপসংশ্লিষ্ট শেয়ার কত শতাংশ?
আমরা ব্যাংকের সব শেয়ারের মালিকানা পর্যবেক্ষণ করে দেখছি। এতে এস আলম গ্রুপ কিংবা ওই পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত শেয়ার পেয়েছি মাত্র ৬-৭ শতাংশ। এ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করার মতো শেয়ারের মালিকানাও এস আলম গ্রুপের ছিল না।
আপনি বলছিলেন, এ ব্যাংকের সুশাসন সুদৃঢ় করতে চান। এটি করার জন্য গত দুই মাসে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
সুশাসনের কিছু ঘাটতির কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে। গত দুই মাসে আমরা ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করেছি। এখন সে আলোকে পদক্ষেপ নিচ্ছি। ব্যাংকের সব ধরনের পলিসি ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরীক্ষায় যেসব ত্রুতি-বিচ্যুতি ধরা পড়ছে, সেগুলো সংশোধন করছি। পুনর্গঠিত পর্ষদে যে পাঁচজন পরিচালক নিযুক্ত হয়েছেন, আমিসহ তাদের কারোই ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা মালিকানা এ ব্যাংকে নেই। আমরা সবাই এ ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক। স্বাভাবিকভাবেই আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ছাড়া আমাদের নিজস্ব কোনো এজেন্ডাও নেই। ব্যাংকটিতে কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বড় অভিযোগ হলো এ ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স আন্তর্জাতিক মানের নয়। ব্যাংক পরিচালনায় শরিয়াহর পুরোপুরি অনুসরণ করা হয় না। এক্ষেত্রে আল-আরাফাহ্তে কেমন দেখছেন?
গত দুই মাসের মধ্যে এ ব্যাংকের শরিয়াহ্ কমিটির একটি সভা হয়েছে। সে সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম। সভায় দেশের বিশিষ্ট আলেমরা উপস্থিত ছিলেন। আমি দেখেছি, কমিটির সব সদস্যই শরিয়াহ্ অনুসরণের ক্ষেত্রে খুবই কঠোর। কোন বিনিয়োগটি করা যাবে, কোনটি করা যাবে না, কোন অর্থ মুনাফায় নেয়া যাবে, কোনটি নেয়া যাবে না, সে বিষয়ে তারা চমৎকারভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। শরিয়াহ বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতেই আমরা ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগের সব প্রডাক্ট সাজানোর চেষ্টা করছি। আল-আরাফাহ একটি পূর্ণাঙ্গ ধারার ইসলামী ব্যাংক। এটি কোনো উইন্ড্রো কিংবা শাখা নয়।
তবে দেশের সামগ্রিক ইসলামী ধারার ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। সে পর্যবেক্ষণগুলো আমলে নিলে দেশে এ ধারার ব্যাংকিং আরো বেশি নিরাপদ ও ফলপ্রসূ হবে। এর মধ্যে রয়েছে, দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও পৃথক নীতি ও বিভাগ থাকা দরকার।
আমানতকারীদের আস্থার ওপর ভর করেই যেকোনো ব্যাংক টিকে থাকে। এ আস্থার প্রধান শর্তই গ্রাহক যখন চাইবে, তখনই ব্যাংক আমানতের অর্থ ফেরত দেবে। ইসলামে আমানতদারিতার ক্ষেত্রটি আরো কঠোর। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, দেশের ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোই বেশি সংকটের মধ্যে পড়েছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
আপনি ঠিকই বলেছেন, ইসলামে আমানতদারিতা তথা বিশ্বাস ভঙ্গ কোনোভাবেই যায় না। কিন্তু এখানে সেটি হয়েছে। আমরা জানি, কেন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে। আমি এখন অতীতের সে কালো অধ্যায় টেনে আনতে চাচ্ছি না। এটি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা ভবিষ্যতের কথা ভাবতে চাই। কীভাবে আমানতকারীদের বিশ্বাস আবারো শতভাগ ফেরত আনা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বাস ফেরাতে হলে আমাদেরকে আমানতকারীদের কাছেই যেতে হবে।
যেকোনো ভালো ব্যাংকের বিষয়েও যদি হঠাৎ করে আমাতকারীদের কাছে নেতিবাচক কোনো বার্তা যায়, তাহলে সে ভালো ব্যাংকটিও রাতারাতি খারাপ হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আমরা সেটি দেখেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকনভ্যালি ব্যাংক থেকে একদিনেই গ্রাহক ৪০ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়ে যান। ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে আস্থাই সবচেয়ে বড় বিষয়। এখন আস্থা ফেরাতে আমাদের সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও বড় ধরনের দায়িত্ব রয়েছে। আমানতকারীদের আস্থার ঘাটতি দূর করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। তবে এও মনে রাখতে হবে, এটি রাতারাতি হবে না। এজন্য সব পক্ষকে ধৈর্যের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের অবয়ব ও আর্থিক সূচকগুলো সম্পর্কে জানতে চাই?
এ ব্যাংকের বয়স এখন ৩০ বছর। ১৯৯৫ সালে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সারা দেশে এ ব্যাংকের ২২৬টি শাখা ও ৭৭টি উপশাখা রয়েছে। আমাদের কাছে জমা আছে গ্রাহকের ৪৯ হাজার ৫১৩ কোটি টাকার আমানত। এ ব্যাংকের ৪৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ স্থিতিও রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আল-আরাফাহ্ ৭৫৭ কোটি টাকার মুনাফা পেয়েছে। এ ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখ, এর মধ্যে ২ লাখ ৫ হাজার বিনিয়োগ গ্রহিতা।দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। একই সময়ে ২৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে ইসলামিক ওয়ালেট। বর্তমানে এ ওয়ালেট ব্যবহার করে এক লাখেরও বেশি গ্রাহক ফান্ড ট্রান্সফার, ইউটিলিটি বিল প্রদান, মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা উপভোগ করছেন।
গ্রাহকের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের উদ্দেশে আমার বার্তা, আপনারা আমাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুন। গত ৩০ বছর যেভাবে আস্থা রেখেছেন, সেভাবেই রাখুন। আপনারা যে ধরনের সেবা চান, সেটিই নিশ্চিত করা হবে। আপনাদের আস্থা আর ভালোবাসার কারণেই এ ব্যাংকটি আজকের জায়গায় আসতে পেরেছে।
আর বিনিয়োগ গ্রহীতাদের বলতে চাই, ‘আমরা আপনাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকতে চাই। আপনারাও ব্যাংকের পাশে থাকুন। দেশের করপোরেট, এসএমই, রিটেইলসহ সব খাতেই এ ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে। বিশেষ করে শিল্প খাতে আমাদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও সবচেয়ে বড়। আগামীতে এসএমই, রিটেইল ও কনজিউমার খাতে আমাদের বিনিয়োগ আরো বাড়ানো হবে।