অথচ স্থানীয় মৎস্য বিভাগ চাঁদপুরের মতলবের মেঘনা নদীর শাখা ধনাগোদা ও গোমতী নদীতে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে বলে দাবি করছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই। মৎস্য বিভাগের তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে বাজারের বাস্তবতার বড় ধরনের অমিল থাকায় প্রশ্ন তুলছেন জেলে, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। তাদের দাবি, বড় ইলিশের পরিবর্তে ধরা পড়ছে ছোট মাছ ও জাটকা। গবেষকরা বলেছেন, নদীর নাব্যতা সংকট, চর জেগে ওঠায় স্বাভাবিক নৌ-চলাচলে বাধা এবং পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পদ্মা ও মেঘনা নদীতে ইলিশ উৎপাদন কমছে। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও দূষণের কারণে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চাঁদপুরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন দেখানো হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৭২ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ১০৪ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৪ হাজার ৩২৬ টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ১৪ হাজার ৫৩৮ টন। অর্থাৎ কাগজে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কিন্তু বাজারের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মাছ ব্যবসায়ীরা বলেন, অন্য বছর এ সময়ে প্রতিদিন এক-দেড় হাজার মণ ইলিশ বাজারে আসত। এবার এ সময়ে প্রতিদিন ৭০-৮০ মণ ইলিশও আসছে না। সরবরাহ কম থাকায় বেড়েছে দামও। গত বছর এ সময়ে এক কেজি ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে একই আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায়।
ইলিশ গবেষকরা জানান, চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে ইলিশ উৎপাদন কমার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর নাব্যতা সংকট, চর জেগে ওঠায় স্বাভাবিক চলাচলে বাধা ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া। এছাড়া অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও দূষণও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। নদীর ভৌগোলিক ও পরিবেশগত সমস্যার মধ্যে রয়েছে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গভীরতা ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় ২০টির বেশি চর জেগে ওঠায় ইলিশের স্বাভাবিক যাতায়াত ও বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বৃষ্টির ধরন ও নদীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা বদলে যাওয়ায় মাছের প্রজনন চক্র ব্যাহত হচ্ছে।
চাঁদপুর মাছঘাটের ইলিশ ব্যবসায়ী ও মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারী মানিক জমাদার বলেন, জাটকা সংরক্ষণ, মা-ইলিশ রক্ষা, জেলেদের খাদ্যসহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন বাড়ছে না।’
বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান আনিসুর রহমান গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইলিশ কম পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান দুটি কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি মানুষের সৃষ্ট সমস্যা এবং দ্বিতীয়টি প্রাকৃতিক কারণ। কারেন্ট ও চায়না জাল দিয়ে জেলেরা জাটকা ধরছেন, নৌযানের মাধ্যমে পানিদূষণ হচ্ছে, নদীসংলগ্ন ফসলের জমিতে সার ব্যবহারের ফলে পানিদূষণ হচ্ছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে, বৃষ্টি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকছে না। আমাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তায় এসব সমস্যা প্রতিহত করতে হবে।’
বাস্তবের চেয়ে অফিসের পরিসংখ্যানে মাছের উৎপাদন বেশি—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এমনটি হয়ে থাকলে তা ঠিক হয়নি। তবে আশা করি, আগামীতে এ বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রতিবেদন উঠে আসবে।’
আনিসুর রহমান বলেন, ‘নদীর পরিবেশ, পানিপ্রবাহ, মাছ চলাচলের পথ, প্রাকৃতিক পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার পর ইলিশের সরবরাহ কমার কারণ ও করণীয় বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে প্রতিবেদন দেয়া হবে।’
চাঁদপুর সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, ‘চাঁদপুর নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় এখানে জেলের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তবে অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, নদীদূষণ ও মেঘনায় বিভিন্ন ডুবোচর জেগে ওঠায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণ উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে আমরা মনে করি।’