২০২৫ সাল ছিল সড়কে সর্বোচ্চ মৃত্যুর বছর

সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৫ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ তথ্য দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)।

সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৫ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ তথ্য দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। সংস্থাটির হিসাবে দেশের সড়কে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে গত বছর। সরকারি হিসাবে এমন সময়ে সড়কে বছরে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হলো যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে জুলাই অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার, যে অভ্যুত্থানের বীজ ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে প্রোথিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশে বিশৃঙ্খল সড়ক পরিবহন খাত সংস্কারের একটা বড় সুযোগ ছিল বর্তমান সরকারের হাতে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তা করতে পারেনি, উল্টো এ সময়ে সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বছর ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আট বছর পর সংখ্যাটি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। আন্দোলনের পর তৎকালীন (পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাচ্যুত) আওয়ামী লীগ সরকার নিরাপদ সড়ক আইন পাস করে। সড়ক নিরাপদ করতে গঠন করা হয় টাস্কফোর্স। যদিও পরবর্তী সময়ে সড়ক আইনের কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি। উল্টো সেই সরকার আইনে সংশোধন এনে জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে দেয়। দুটি অজামিনযোগ্য ধারাকে জামিনযোগ্য করা হয়। অবাস্তবায়িত থেকে যায় টাস্কফোর্সের বেশির ভাগ সুপারিশ। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন খাতে কোনো পরিবর্তন না আসায় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা। ২০১৯ সালে ৪ হাজার ১৩৮ জন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৯১৮ জন, ২০২১ সালে ৫ হাজার ৮৪ জন, ২০২২ সালে ৪ হাজার ৬৩৬ জন, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ২৪ জন ও ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫ হাজার ৪৮০ জন।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মূলত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারাই ২০২৪ সালে ছিলেন বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী। তাদের নেতৃত্বেই জুলাইয়ে গড়ে ওঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। পতন হয় আওয়ামী সরকারের। গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার, যাতে শিক্ষার্থীদের প্রভাব দৃশ্যমান ছিল। জুলাই আন্দোলনের অনেক নেতা-কর্মীর রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি দেখাতে পারেনি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। কোটা আন্দোলনের কিছুদিন পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তাতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের আট বছর পর এসে সড়কে মৃত্যু দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়াকে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন তিনি।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সামান্তা শারমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যেসব দাবি ছিল, তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই ছিল সড়ক অবকাঠামোগত উন্নয়নের জায়গা থেকে। শিক্ষার্থীরা সে সময় নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার মূল জায়গাটি ধরতে পারেনি। যদিও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যেটা করতে পেরেছে, সেটাই অনেক বেশি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের এ দাবিগুলোও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এটা বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। এ ব্যর্থতা আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌আমরা সড়ককে প্রাণহানিকর নয়, মানুষের জন্য উপকারী হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু এর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবহন মালিকরা। তারা যেভাবে চান, সরকার বা মন্ত্রণালয় সেভাবেই কাজ করে। তারা সবসময় এমন একটা ব্যবস্থা জিইয়ে রাখেন, যেখানে অব্যবস্থাপনা-বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান থাকে। যা শেষ পর্যন্ত সড়কে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সড়কে এক বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মৃত্যু আমাদের আমলে নেয়া উচিত। যদি দেশের রাজনীতি সুস্থ না হয় তাহলে এ সমস্যার সমাধান কোনোদিনই হবে না।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়কে নিরাপত্তার জন্য পরিবহন খাতের সংস্কার খুব জরুরি ছিল। বড় সংস্কার দরকার ছিল। যদিও এ সময়ে আমরা দেখেছি ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো অবৈজ্ঞানিক যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহনসহ পরিবহন খাতে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার সব উপাদান আগের মতোই রয়েছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দায় যেমন রয়েছে, তেমনি দেশের পরিবহন খাতের সরকারি-বেসরকারি ও রাজনৈতিক অংশীজনেরাও সরকারকে তেমন সহযোগিতা করেনি। পরিবহন খাতের এ বিশৃঙ্খলা পরবর্তী সরকারের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।’

পরিবহন খাতে সংস্কার বা পরিবর্তনের জন্য ন্যূনতম যেসব নীতি প্রণয়ন বা গ্রহণ এবং যেসব প্রারম্ভিক কাজ করা দরকার ছিল, তা এ সরকার করতে ব্যর্থ হয়েছে মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ‘‌বিগত যত সরকার ছিল, যে কালচারের মধ্য দিয়ে চলছিল, অর্থাৎ সেখানে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার যে দুর্বলতা, সেই দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে। যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। অতীতেও এ কাজ করা হয়নি। এখনো হচ্ছে না। তাহলে পরিবর্তন হবে কীভাবে?’

দেশে ৭৫ হাজারের বেশি বাস ও ট্রাক মেয়াদোত্তীর্ণ। অর্থনৈতিক আয়ু শেষ হওয়া এসব মোটরযান সড়কে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ। ‘লক্কড়ঝক্কড়’ গাড়িগুলো পরিবেশদূষণেও রাখছে বড় ভূমিকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দায়িত্ব নেয়ার পর মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তা থেকে সরিয়ে নিতে উদ্যোগী হন। উপদেষ্টা ঘোষণা দেন মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়িগুলো সরিয়ে নিতে মালিকরা ছয় মাস সময় পাবেন। যদিও এখনো সড়কে অবাধেই চলাচল করছে এসব যানবাহন।

সম্প্রতি দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ১৩টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। কারণগুলো হলো ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, ওভারলোড, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, চালকদের বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি, আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

দেশের সড়ক ব্যবস্থার এসব সমস্যা সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কিছু করে দেখাতে পারেনি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান কোনো মন্তব্য করেননি। গতকাল বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে বিআরটিএর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বাড়লেও সরকার দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা এবং দেশের সড়ক পরিবহন খাতকে সুশৃঙ্খল করতে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের সুফল কয়েক মাস পর থেকে দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।’

পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‌সড়ক নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের বাইরে বিআরটিএর মাধ্যমে পরিবহন চালকদের ৬০ ঘণ্টার বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়েছে। দেশের এক হাজার পরিবহন চালকের চোখ পরীক্ষা করে চশমা সরবরাহ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া, বিশেষ পরীক্ষাগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং বেশকিছু নতুন নিয়মকানুন আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌আমরা সড়ক বিভাগ থেকে বিশেষায়িত একটি বা দুটি ইউনিট করার পরিকল্পনা করেছিলাম, যাদের কাজ হবে সড়কের দুর্বলতার কারণে কোনো দুর্ঘটনা হলে তা যাচাই-বাছাই করা। সময়স্বল্পতার কারণে এ কাজ হয়তো আমরা করতে পারব না। আশা করছি পরবর্তী সরকার এটা বাস্তবায়ন করবে। এর বাইরে আমরা যানবাহনে জিপিএস ট্র্যাকার স্থাপনের পরিকল্পনা করছি। এসব ট্র্যাকার দিয়ে যানবাহন চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’

আরও