জ্বালানি নিরাপত্তায় কাঠামোগত সংস্কার ও শুল্ক সমন্বয় জরুরি

—জ্যঁ পেম

ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান), বিশ্বব্যাংক

জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল একটি খাতের অগ্রাধিকার নয়, এটি বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং রাজস্ব টেকসইকরণের অন্যতম মূল ভিত্তি।

সবার কাছে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশকিছু সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এ খাত এখনো বড় ধরনের কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। আর মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা মনে করিয়ে দিয়েছে যে ভেতরের দুর্বলতাগুলো কতটা তীব্র এবং কত দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

এর অন্যতম কারণ আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, সেই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের খরচ এবং গ্রাহক পর্যায়ের শুল্কের মধ্যে থাকা ক্রমাগত ব্যবধান। বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদার ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং সরবরাহ চেইনের বিঘ্নতা সরাসরি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তবে এটি কেবল আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তির পুরনো ও ব্যয়বহুল দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সম্পর্কিত, যা বড় ধরনের রাজস্ব চাপ এবং বছর শেষে আর্থিক দুর্বলতা তৈরি করছে। সুতরাং, এখনই এমন পদক্ষেপ নেয়া দরকার যা এ খাতকে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে এবং সেই সঙ্গে আস্থা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব ঝুঁকি কমানো এবং আরো বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথ তৈরি করার সদিচ্ছা ও প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করবে।

বিশ্বব্যাংক এ সংকট সমাধানে চারটি বিষয় চিহ্নিত করেছে। প্রথমত, আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে জ্বালানি খাত ও ট্যারিফ ব্যবস্থার সংস্কার। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্য বাড়ানো। তৃতীয়ত, সবুজ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার সহনশীলতা নিশ্চিত করা। সবশেষে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে গ্যাসের ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করা।

এদের মধ্যে জ্বালানি ভর্তুকি এখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক চাপের একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটি জনকল্যাণমূলক অগ্রাধিকার খাতের ব্যয়গুলোকে সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। আমরা অনুমান করছি এটি জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ। সামষ্টিক অর্থনীতিতে এবং উচ্চ আমদানি খরচের ক্ষেত্রে এর একটি বড় প্রভাব রয়েছে। তাই আমরা মনে করি একটি নির্ভরযোগ্য এবং পর্যায়ক্রমিক শুল্ক সংস্কারের রূপরেখা প্রয়োজন, যা শুল্কের বণ্টনের প্রভাবকেও বিবেচনায় নেবে। সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব যেন সঠিকভাবে সামলানো যায় তা নিশ্চিত করবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বৈচিত্র্য আনবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। ভুটান ও নেপাল থেকে আমদানি করা জলবিদ্যুতের মাধ্যমে কম খরচে এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার নির্ধারিত কিছু সরকারি জমিতে গিগাওয়াট-স্কেলের সোলার পার্ক তৈরির কথা বিবেচনা করে এর চেয়েও বেশি কিছু করতে পারে। এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন হতে পারে, বিশেষ করে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গভীর সমুদ্রবন্দর বা অর্থনৈতিক অঞ্চল অথবা রেলওয়ের মালিকানাধীন জমিতে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, এ উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নেয়া এবং এর পরিধি বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে যে গতিতে কাজ হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুতও এটি বাস্তবায়ন করা যায়।

এক্ষেত্রে ভিয়েতনাম একটি খুব ভালো উদাহরণ, যেখানে সুস্পষ্ট নীতিগত সংকেত, ব্যাংকযোগ্য শুল্ক এবং শক্তিশালী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থাকার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় আকারের সোলার প্লান্ট স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং নমনীয়তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এখনো সঞ্চালন ও বিতরণের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে, যা দক্ষ বিদ্যুৎ সরবরাহকে ব্যাহত করে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংমিশ্রণ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সুযোগকে সীমিত করে। তাই আমাদের মতে, সবুজ অবকাঠামোতে টেকসই বিনিয়োগ, ব্যবস্থার কার্যকারিতা উন্নয়ন এবং গ্রিডের নমনীয়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করার বিষয়টিও সংস্কারের অংশ হওয়া উচিত।

সবশেষে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মজুদ ব্যবস্থা ও সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং এ ভ্যালু চেইনে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে গ্যাস খাতকে শক্তিশালী করা জরুরি। আমাদের বিবেচনায়, সংস্কারের মৌলিক ভিত্তিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট করণীয় নির্ধারণ, সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা এবং বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা। একই সঙ্গে নীতিগত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য ও পরিপূরক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ এখন জ্বালানি রূপান্তরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এ সংস্কারের প্রতি সরকার ও প্রধান অংশীজনদের প্রতিশ্রুতিকে আমরা স্বাগত জানাই। বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বিশ্বব্যাংক এ রূপান্তর প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নীতিগত ও বাস্তবায়নগত সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।

আরও