নির্মাণের এক বছরেই বাঁধে ভাঙন, জোয়ারে ডুবছে হাতিয়া ও সুবর্ণচর উপকূল

নোয়াখালীর হাতিয়া ও সুবর্ণচর উপকূল সুরক্ষায় প্রায় ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

নোয়াখালীর হাতিয়া ও সুবর্ণচর উপকূল সুরক্ষায় প্রায় ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ২০২৪ সালে হাতিয়া উপজেলার হরণি ইউনিয়নের টাংকির ঘাট থেকে সুবর্ণচরের মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হয় ৪০ কোটি টাকা। তবে নির্মাণের এক বছরেই দেখা দিয়েছে ভাঙন। হাতিয়ার হাজীগ্রামে অন্তত ৫০০ মিটার বাঁধ ধসে গেছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে উপকূলীয় অঞ্চল দুটির বাসিন্দারা। এরই মধ্যে কয়েকশ পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করায় অল্প সময়ের মধ্যে জোয়ারে ধসে পড়েছে। এতে সরকারের অর্থের অপচয় হলেও স্বার্থ রক্ষা হয়নি মানুষের।

যদিও বাঁধ নির্মাণকে অপরিকল্পিত বলতে নারাজ পাউবো কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, নিয়ম মেনেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ধসে যাওয়া অংশ মেরামতসহ ভাঙন রোধেও কাজ হাতে নিয়েছেন তারা।

সরজমিনে দেখা গেছে, দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নের হাজীগ্রামে উপকূল সুরক্ষা বাঁধের অন্তত ৫০০ মিটার ধসে পড়েছে। চলতি বছরের জুন-জুলাইয়ে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সৃষ্ট মেঘনা নদীর জোয়ারে মূলত বাঁধটিতে ধস দেখা দেয়। এক বছর আগে মেঘনার আধা কিলোমিটার দূরত্বে নির্মাণ করা হয় বাঁধটি। অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করায় বছর যেতে না যেতেই জোয়ারে বাঁধের একটি অংশ ধসে পড়েছে। এতে হাজীগ্রাম ও ভূঁইয়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকা প্রতিদিন জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে। এরই মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে কয়েকশ পরিবার।

স্থানীয় বাসিন্দা জামসেদ আলী বলেন, ‘২০২৪ সালের দিকে বাঁধটি নির্মাণ শেষ করে পূর্ব-উত্তর দিকে চলে যায়। যখন বাঁধ নির্মাণ করছিল তখন নদী মাত্র আধা কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল। বাঁধটিও যেনতেনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে প্রতিদিনই মেঘনা নদীর ভাঙনের শিকার হচ্ছে ওই এলাকা, সেখানে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরত্বে বাঁধ নির্মাণ করাটা অপরিকল্পিতই বলা চলে।’

তিনি জানান, অন্তত এক-দেড় কিলোমিটার দূরত্বে বাঁধ নির্মাণ করা দরকার ছিল। একই সঙ্গে নদীতে জিও টিউব বা ব্লক দেয়ার দরকার ছিল। তাহলে জোয়ারে বাঁধ ধসে পড়ত না। মাত্র এক বছরেই বাঁধের বড় একটি অংশ ধসে গেছে। এতে সরকারের অর্থের অপচয় যেমন হয়েছে, অন্যদিকে লাভবান হতে পারেনি স্থানীয়রা।

হাজীগ্রাম ও ভূঁইয়া গ্রাম ছাড়াও জুনের শুরু থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মেঘনার জোয়ারে হাতিয়ার ইসলামপুর বাজার, করিমবাজার, ভূমিহীন বাজারের পূর্বপাশ এবং সুবর্ণচর উপজেলার চর ক্লার্ক ইউনিয়নের চর উরিয়া, মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চরবায়েজিদ কাটাখালী, চর আকরাম উদ্দিন, চর খন্দকার ও চর নোমানসহ সুরক্ষা বাঁধের বেশ কয়েকটি স্থান ধসে গেছে।

হরণি ইউনিয়নের বয়ারচর এলাকার বাসিন্দা আহমেদ রাজু জানান, বাঁধের দুই অংশে ঘাস দেয়ার কথা ছিল। তবে যেভাবে দেয়ার কথা ছিল সেভাবে ঘাস দেয়া হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে বাঁধের দুই অংশের মাটি সরে গেছে। আবার ওপরের অংশে গর্ত তৈরি হয়েছে। বাঁধটি অনেকটা সরু হয়ে গেছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, চর উন্নয়ন, বসতি স্থাপন প্রকল্প, সিডিএসপি ব্রিজিং অতিরিক্ত উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে উপকূলীয় সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দরপত্র হয়। তবে বেশির ভাগ কাজ করা হয় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ১০টি প্যাকেজে দরপত্র হলেও কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আলী ট্রেডার্স, ইউনুস ব্রাদার্স ও আমিন অ্যান্ড কোম্পানি। আলী ট্রেডার্সের মালিক নোয়াখালী-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী। হাতিয়া উপজেলার হরণি ইউনিয়নের টাংকির ঘাট থেকে সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার বাঁধ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে পাউবো। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধটি উপকূল সুরক্ষার জন্য নয়, মূলত একটি গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার জন্যই প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হয়েছে।

তবে বাঁধ নির্মাণকে অপরিকল্পিত বলতে নারাজ পাউবো কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির নোয়াখালী জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হালিম সালেহী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি যোগদানের আগেই বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়েছে। সম্ভাব্যতা ও উপযোগিতা যাচাই শেষে কোথায় বাঁধ নির্মাণ করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সে আলোকেই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। যেহেতু নদীতে প্রতিদিনই জোয়ার আসছে। তাছাড়া বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে কিছু কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো পুনরায় নির্মাণকাজ হাতে নেয়া হয়েছে। নতুন করে বাঁধ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য নদীতে জিও টিউব ও বিভিন্ন অংশে ব্লক দেয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

আরও