নওগাঁয় ব্লাস্ট রোগ, কারেন্ট পোকার আক্রমণ ও ইঁদুরের উপদ্রবে প্রায় ৭৬ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলতি মৌসুমে হঠাৎ করেই এসব সমস্যার মুখে পড়েন স্থানীয় কৃষক। এতে জমির পাকা ও আধা পাকা ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তারা। কৃষকদের অভিযোগ, যথাসময়ে সঠিক কৃষি পরামর্শ না পাওয়া ও বালাই ব্যবস্থাপনার অভাবে তারা বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। যদিও আক্রান্ত জমির সঠিক কোনো পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি কৃষি বিভাগ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩০০ হেক্টরে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১০ হাজার ৪৫ হেক্টর, রানীনগরে ১৯ হাজার ৫৮৫, আত্রাইয়ে ৬ হাজার ৯৮৫, বদলগাছীতে ১৪ হাজার ৩৫০, মহাদেবপুরে ২৮ হাজার ৯০০, মান্দায় ১৫ হাজার ৭৫০, পত্নীতলায় ২৫ হাজার ৪১০, ধামইরহাটে ২০ হাজার ৪৭০, সাপাহারে ৯ হাজার ৭৯৫, পোরশায় ১৫ হাজার ১০০ ও নিয়ামতপুরে ২৯ হাজার ৯১০ হেক্টর রয়েছে।
এসব জমি থেকে ৯ লাখ ৩২ হাজার ২১৫ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। এ বছর স্বর্ণা-৫, বিনা-৭ ও ১৭, জিরাশাইল, চিনি আতপসহ ব্রিধানের কয়েকটি জাতের ধান চাষ করেছেন চাষীরা। এরই মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির আগাম জাতের ধান কাটাও শেষ হয়েছে।
এ বছর অনাবৃষ্টির কারণে সেচ সংকটের মধ্যেও বেশ কষ্ট করেই আমন ধান চাষ করেছিলেন চাষীরা। এক সপ্তাহের মধ্যেই জেলাজুড়ে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগেই হানা দিয়েছে ব্লাস্ট রোগ, কারেন্ট পোকার আক্রমণ ও ইঁদুরের উপদ্রব। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৭৫ হাজার ৮১৭ হেক্টর জমি এসব সমস্যার কবলে পড়েছে। ফলে এ বিপুল পরিমাণ জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ জমিতে সদ্য শীষ আসা আমন ধানের পাতাসহ গিঁটে বাদামি ও কালো রঙের দাগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শীষের গোড়া থেকে পচন দেখা দিয়েছে। ধানের কচি শীষ থেকে শুরু করে পাকা শীষ সব জায়গাতেই কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। যেসব জমিতে কারেন্ট পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে তার প্রায় ৭০ শতাংশ শীষই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে পার্শ্ববর্তী খেতগুলোর ফসলে আক্রমণ চালাচ্ছে এ পোকার দল। আশপাশে কোনো ফসলের খেত না পেলে গাছের গোড়ায় অবস্থান নিয়ে বংশ বিস্তার করছে কারেন্ট পোকা। কীটনাশক প্রয়োগ করেও কারেন্ট ও ব্লাস্ট রোগ নিয়ন্ত্রণে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক। আবার নতুন সমস্যা হিসেবে যোগ হয়েছে ইঁদুর। ফসলের মাঠে গর্তের ভেতরে অবস্থান নিয়ে প্রতিনিয়ত পাকা ও আধা পাকা ধানের শীষ কেটে দিচ্ছে কালো ইঁদুরের দল।
নওগাঁ সদর উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের চুনিয়াগাড়ী পূর্বপাড়া গ্রামের কৃষক শামসুর রহমান বলেন, ‘ধান চাষের জন্য এক বিঘা জমি বর্গা নিয়েছিলাম। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সেখানে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ করে স্বর্ণা-৫ জাতের ধান আবাদ করেছি। ধানের শীষ পাকার আগ মুহূর্তে ব্লাস্ট রোগ ও পাকার পর কারেন্ট পোকার আক্রমণে সম্পূর্ণ ধান নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কৃষি অফিসের কেউই জমির খোঁজখবর নিতে আসেননি। এখন যা খরচ করেছি পুরো টাকাই লোকসান হয়েছে। এনজিওর টাকা পরিশোধ করাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।’
মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়নের বাগদানা গ্রামের কৃষক রশিদুল আলম বলেন, ‘দেড় বিঘা জমিতে ব্রিধান-৪৯ জাতের ধানের আবাদ করেছিলাম, যেখানে কমপক্ষে ৩০ মণ ফলন পাওয়ার আশা ছিল। কারেন্ট পোকা সেই জমির প্রায় অর্ধেক ধান সাফ করে ফেলেছে। প্রায় দেড় হাজার টাকার বিভিন্ন কীটনাশক প্রয়োগ করেও শেষ রক্ষা করতে পারিনি। একদিকে বাজার নকল কীটনাশকে সয়লাব, অন্যদিকে সঠিক কৃষি পরামর্শও পাওয়া যায়নি। ফলে বিপুল ক্ষতির মধ্যে পড়তে হয়েছে।’
পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছিলেন মান্দা উপজেলার ভারশো ইউনিয়নের আলালপুর গ্রামের কৃষক সামাদ শেখ। তিনি বলেন, এর মধ্যে দুই বিঘা জমির সম্পূর্ণ ধান পেকেছে এবং তিন বিঘায় কেবল শীষ এসেছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ফসল কাটা শুরুর কথা। এরই মধ্যে একদল কারেন্ট পোকা এসে ধানের কাঁচা ও পাকা শীষ নষ্ট করতে শুরু করেছে। কীটনাশক প্রয়োগ করেও পোকা দমন করা যাচ্ছে না। ইঁদুরের উপদ্রব তো আছেই। আর কয়েকদিন অপেক্ষা করলে জমির সমস্ত ধান পোকার পেটে চলে যাবে।
কৃষকরা কৃষি বিভাগের পরামর্শ না পাওয়ার কথা জানালেও সদর উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের চুনিয়াগাড়ী ব্লকে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিমল চন্দ্র রায় বলেন, পোকার আক্রমণ ও ব্লাস্ট রোগ নিয়ন্ত্রণে চাষীদের প্রতিনিয়ত কৃষি পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তার ব্লকের আওতাভুক্ত ৩৪০ হেক্টরের প্রায় সব জমিতেই কারেন্ট পোকার উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। তবে কারেন্ট পোকার চেয়ে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধানের বেশি ক্ষতি হচ্ছে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় জেলার প্রায় সব মাঠের ফসলই ভালো অবস্থায় আছে। তবে সব জমিতেই ইঁদুরের উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছে। ইঁদুরের উপদ্রব, ব্লাস্ট রোগ ও কারেন্ট পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার্থে চাষীদের মাঝে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণসহ নিয়মিত কৃষি পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। প্রতি বছরের মতো এবারো কিছু জমিতে ব্লাস্ট রোগ ও কারেন্ট পোকার আক্রমণ আছে। আলোকফাঁদ ব্যবহার করে পোকার উপস্থিতি শনাক্ত করে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।
চাষীরা আগের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি সচেতন উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা বলেন, কোথাও পোকার আক্রমণ ও ব্লাস্ট রোগ হলে তাত্ক্ষণিক কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে তা দমন করছেন। কীটনাশক কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করা হয়েছে। এর পরও যদি কোথাও ব্যাপক হারে পোকার আক্রমণ হয় বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।
ফসল ঘরে তোলার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চাষীরা সচেতন থাকলে এ বছর কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সহজেই অর্জিত হবে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগের এ কর্মকর্তা।