সংরক্ষিত বন : সংকট ও সম্ভাবনা

সংকুচিত হচ্ছে রাতারগুল, শোরগোল প্লাস্টিকে হুমকিতে বাস্তুতন্ত্র

বন বিভাগের দাবি, রাতারগুল বিটের প্রায় ৮০ একর জমির এনক্রোচমেন্ট (দখল জটিলতা) নিয়ে আদালতে মামলা চলমান।

দেশের একমাত্র স্বাদু পানির জলাবন সিলেটের ‘রাতারগুল’। একদিকে বেশিরভাগ জমি দখল ও অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলনে বনের সীমানা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত পর্যটক সমাগম, ইঞ্জিনচালিত নৌকার শোরগোল এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে চরম হুমকির মুখে পড়েছে বনের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকা প্রাণিকুল। বন বিভাগের দাবি, রাতারগুল বিটের প্রায় ৮০ একর জমির এনক্রোচমেন্ট (দখল জটিলতা) নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। বন বিভাগের পক্ষ থেকে সব জবাব ও সাক্ষ্য প্রদান সম্পন্ন হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বন বিভাগের উত্তর সিলেট রেঞ্জ-২-এর অধীনে রাতারগুল বিটের সরকারি নথিপত্রে মোট ভূমির পরিমাণ ৩ হাজার ৩২৫ দশমিক ৬১ একর। তবে মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা অনুযায়ী, এর মধ্যে মাত্র ৮১৯ দশমিক ৬১ একর জমি বন বিভাগের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থাৎ বনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জমিই দীর্ঘদিন ধরে বেদখল বা বেহাত হয়ে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমানা নির্ধারণের জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে বনের চারপাশে এবং ভেতরে প্রভাবশালী মহল কৃষিজমি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপন এবং অবৈধ মাছের ঘের তৈরি করেছে। বাফার জোনগুলো দখলমুক্ত না হওয়ায় এবং চারপাশ সংকুচিত হতে থাকায় বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বন অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।

এদিকে রাতারগুলের টিকে থাকার ওপর আরো একটি বড় আঘাত হয়ে এসেছে চেঙ্গের খাল ও গোয়াইন নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলন। বনের জলুরমুখ ও মাঝেরঘাট এলাকায় রাতের আঁধারে ড্রেজার বা ‘বালিখেকো’ চক্রের অবাধে বালি তোলার ফলে নদীর তলদেশ ও পাড় আলাদা হয়ে গেছে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন সিলেট বন বিভাগের সারী রেঞ্জের কর্মকর্তা মো. শাহ আলম ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বালি চোরেরা অপচেষ্টা করেনি তা নয়, তবে আমরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে তাদের প্রতিহত করেছি। অভিযানের মাধ্যমে আমরা একটি বড় “‍বাল্কহেড” জব্দ করি। বন আদালতের বিচারে জড়িত আসামিদের ছয় মাসের সাজা হয়েছে এবং বাল্কহেডটি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরো একটি বাল্কহেড জব্দ করে থানায় মামলা দায়েরের পর আলামত হিসেবে পুলিশের কাছে জিম্মায় দেয়া হয়েছে। এসব কঠোর পদক্ষেপে বর্তমানে বালু তোলার অপচেষ্টা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বালিখেকোদের কারণে সোয়াম্প ফরেস্টের ঐতিহ্যবাহী হিজল ও করচ গাছ শিকড়সহ নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনের তীব্রতায় বনের মূল আয়তন কমার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী চালিতাবাড়ী ও মাঝেরঘাটসহ একাধিক গ্রামের কৃষিজমি ও বসতভিটা নদীতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।’

রাতারগুলে বেড়াতে যাওয়া সিলেট এমসি কলেজের শিক্ষার্থী সৈকত তালুকদার বলেন, ‘আগে এখানে এসে নিস্তব্ধ প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ পাওয়া যেত। বনের ভেতরে পর্যটকদের কোলাহলে আর আগের মতো পাখির দেখা মেলে না। পানির ঘোলাটে ভাব আর প্রাণিকুলের অভাব বোধ হয়।’

পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমি সন্তান বাংলাদেশের সংগঠক শুয়াইবুল ইসলাম বলেন, ‘অবিলম্বে বেহাত হওয়া জমি উদ্ধার, প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ এবং পর্যটক প্রবেশের সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন না করলে রাতারগুলকে রক্ষা করা যাবে না। কারণ আজ থেকে চার-পাঁচ বছর আগের রাতারগুল আর নেই।’

সিলেট বন বিভাগের সারী রেঞ্জের কর্মকর্তা মো. শাহ আলম ইসলাম জানান, বনের সার্বিক সুরক্ষায় প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‌বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রাতেও আমাদের বিশেষ টহল টিম নিয়োজিত থাকে, ফলে বনে মাছ শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।’

জমি বেদখলের বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন, ‘রাতারগুলের বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার আয়তন প্রায় সাড়ে ৫০০ একর, যার মধ্যে কোনো বেদখল নেই। এটি পুরোপুরি বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে সুরক্ষিত রয়েছে। তবে রাতারগুল বিটের প্রায় ৮০ একর জমির এনক্রোচমেন্ট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান।’

আরও