সাকার ফিশের পর নতুন এ বিদেশী কচ্ছপের বিস্তার ঢাকার জলজ বাস্তুতন্ত্র নিয়ে পরিবেশসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে ‘চায়না খলিশা’ নামে পরিচিত ‘থাই গুরামি’ মাছও দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ পিরানহা ও আফ্রিকান মাগুরের উপস্থিতি তো দেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে আগে থেকেই রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাকুয়ারিয়ামে পালিত এসব জলজ প্রাণী দ্রুত দেশের বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ায় গাঙ্গেয় বদ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খল মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে। এখনই বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে বিদেশী আগ্রাসী প্রজাতি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। একই সঙ্গে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে জনস্বাস্থ্যের ওপরও।
একসময় মূলত অভিজাতদের মধ্যেই বাড়ির অ্যাকুয়ারিয়ামে বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশী মাছ পালনের প্রবণতা ছিল। পরে এ শখ ধনী ও মধ্যবিত্তদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। মাছ বড় হয়ে গেলে, সংখ্যা বেড়ে গেলে কিংবা বাসা পরিবর্তনের সময় অনেকেই অ্যাকুয়ারিয়ামে পালা মাছ পার্শ্ববর্তী লেক, ড্রেন, খাল বা পুকুরে ছেড়ে দেন। সেখান থেকে মাছগুলো আশপাশের নদ-নদীতে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
অ্যাকুয়ারিয়ামে পালনের জন্য জনপ্রিয় বিদেশী মাছগুলোর একটি সাকার ফিশ। প্রায় দুই দশক ধরে বুড়িগঙ্গায় মাছটির উপস্থিতি রয়েছে। অ্যাকুয়ারিয়ামে সাধারণত শেওলা ও জমে থাকা জৈব বর্জ্য খেয়ে বেঁচে থাকা এ মাছ উন্মুক্ত জলাশয়ে ছাড়া পাওয়ার পর দ্রুত বংশবিস্তার করে। বুড়িগঙ্গা থেকে এটি শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী হয়ে দেশের অন্যান্য নদ-নদীতেও ছড়িয়ে পড়েছে। একইভাবে পিরানহা ও আফ্রিকান মাগুরও দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ায় একপর্যায়ে সরকার মাছ দুটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে ‘চায়না খলিশা’ নামে পরিচিত থাই গুরামির বিস্তার ঘটেছে। মাছটি স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে এবং মানুষ তা কিনে খাচ্ছেও। বিদেশী এসব আগ্রাসী মাছের প্রজননক্ষমতা বেশি এবং প্রতিকূল পরিবেশেও দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে। কোনো কোনো প্রজাতি দেশীয় মাছ ও সেগুলোর ডিম খাওয়ায় স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
অ্যাকুয়ারিয়ামে পালিত বিদেশী মাছ দেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ায় গাঙ্গেয় বদ্বীপের খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে এসব বিদেশী প্রজাতির সংঘাত দীর্ঘদিনের। আমাদের গাঙ্গেয় বদ্বীপের বাস্তুতন্ত্রে ২০-২৫টির মতো কৃষি-প্রতিবেশগত অঞ্চল রয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলে ভিন্ন জলজ প্রজাতি হাজার বছর ধরে নিজস্ব নিয়মে বসবাস করছে। খাদ্যচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে তারা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখে। সেখানে কোনো বিদেশী প্রাণী ছড়িয়ে পড়লে তার খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণ আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। বিদেশী মাছ ও পাখি শুধু নিজেরাই বিস্তার লাভ করছে না, বরং দেশীয় প্রজাতিগুলোকেও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশীয় মাছের সঙ্গে পাখি, বৃক্ষ ও ফসলের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনো একটি প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব সামগ্রিক খাদ্যচক্রে পড়ে। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা এখনো যথেষ্ট সচেতন নই।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশী আগ্রাসী মাছ দেশীয় মাছের আবাসস্থল নষ্ট করার পাশাপাশি তাদের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাভাবিক জীবনচক্রেও পরিবর্তন ঘটায়। কোনো কোনো বিদেশী প্রজাতি দেশীয় মাছ ও মাছের ডিমও খেয়ে ফেলে। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও সংখ্যা কমে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জলজ জীববৈচিত্র্য এবং ব্যাহত হয় খাদ্যশৃঙ্খলের স্বাভাবিক ভারসাম্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল নাসের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একসময় বাংলাদেশের জলাশয়গুলোয় পিরানহা ও আফ্রিকান মাগুরের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল। পরে সরকার এসব মাছ নিষিদ্ধ করে। বর্তমানে চায়না খলিশা, কুমির মাছ ও বিদেশী কচ্ছপের মতো নতুন নতুন প্রজাতি উন্মুক্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব পুরোপুরি স্পষ্ট হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তবে যে হারে বিদেশী প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে আগামী ২০ বছরের মধ্যে দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে আগ্রাসী মাছ ও জলজ প্রাণীর আমদানি এখনই নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। অ্যাকুয়ারিয়ামে পালনের উপযোগী অনেক দেশীয় মাছ রয়েছে। আগ্রাসী নয়—এমন বিদেশী মাছও পালন করা যেতে পারে। কিন্তু জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ মাছ ও জলজ প্রাণীর বিস্তার রোধে সরকারের নীরব থাকার সুযোগ নেই।’
শুধু শখের কারণে নয়, পাচারের অপরাধ আড়াল করতেও অনেক সময় বিদেশী জলজ প্রাণী রাজধানীর বিভিন্ন জলাশয়ে ছেড়ে দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হচ্ছে। পাচারকারীরা বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেশে নিয়ে আসে। এর কিছু দেশের বাজারে বিক্রি করা হয়, বাকিগুলো সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে পড়লে বা ধরা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে পাচারকারীরা এসব প্রাণী পার্শ্ববর্তী উন্মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেয়। সেখান থেকে বিদেশী মাছ, কচ্ছপ ও অন্যান্য প্রাণী দেশের বাস্তুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে।
গত ৩ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ১০৪টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। এর মধ্যে রেড ইয়ারড স্লাইডার কচ্ছপের বাচ্চা ছিল ৮৪৬টি। এছাড়া উদ্ধার করা হয় আগ্রাসী বিদেশী প্রজাতির ৫৬টি কমন স্ন্যাপিং টার্টল। ইউনিটটির কর্মকর্তারা জানান, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে বিমানবন্দর ব্যবহার করে এসব কচ্ছপ অবৈধভাবে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে অ্যাকুয়ারিয়ামে বিদেশী কচ্ছপ পালনের বাজার তৈরি হয়েছে। তবে কয়েক বছর পর কচ্ছপগুলো বড় হয়ে গেলে অনেকেই আর সেগুলো রাখতে চান না। তখন পুকুর, লেক বা অন্যান্য জলাশয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক বলেন, ‘শুধু হাতিরঝিল নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি পুকুরেও রেড ইয়ারড স্লাইডার দেখা গেছে। সর্বভুক এ কচ্ছপ নদী, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লে দেশীয় জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। মিরপুর থেকে উদ্ধার করা কমন স্ন্যাপিং টার্টল আরো ভয়ংকর। রেড ইয়ারড স্লাইডারের ওজন সাধারণত পাঁচ-ছয় কেজি পর্যন্ত হলেও কমন স্ন্যাপিং টার্টলের ওজন ৩৫-৪০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। উভয় প্রজাতিই সর্বভুক ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।’
জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ বিদেশী আগ্রাসী প্রজাতি নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে বলে জানিয়েছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক এএসএম সাইফুল্লাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো বিদেশী প্রজাতি এতটাই আগ্রাসী যে তারা অন্য প্রাণীকে খেয়ে ফেলে কিংবা সেগুলোর আবাসস্থল ধ্বংস করে। এ কারণেই অস্ট্রেলিয়ায় তেলাপিয়া নিষিদ্ধ করে তা নির্মূলে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জাপানে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বেজি নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছে। বাংলাদেশের প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষায় বিদেশী আগ্রাসী প্রাণীর বিস্তার রোধে এখনই কঠোর হওয়া প্রয়োজন। নাহলে এসব প্রাণী ভবিষ্যতে দেশের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।’
সার্বিক বিষয়ে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল, ঢাকার বন্যপ্রাণী গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদেশী আগ্রাসী প্রজাতির মাছ বা অন্য যেকোনো প্রাণী দেশের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এমনকি বিদেশী আগ্রাসী উদ্ভিদও স্থানীয় প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিদেশী মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর চোরাচালান ঠেকাতে বন অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। বাজারেও অভিযান চালিয়ে এসব প্রাণী জব্দ ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়। দেশের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিদেশী আগ্রাসী প্রজাতির প্রবেশ ও বিস্তার রোধের বিকল্প নেই।’