আইন-শৃঙ্খলায় এখনো বিশৃঙ্খলার ছাপ

অভিযানে গিয়ে দৈনিক দুই পুলিশ আক্রান্ত

অপরাধীদের গ্রেফতার এবং পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পরিচালিত হচ্ছে বিশেষ অভিযান ডেভিলহান্ট ফেইজ-২। বিশেষ এ অভিযান চলা অবস্থায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযানে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

অপরাধীদের গ্রেফতার এবং পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পরিচালিত হচ্ছে বিশেষ অভিযান ডেভিলহান্ট ফেইজ-২। বিশেষ এ অভিযান চলা অবস্থায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযানে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার ধুনটে মব তৈরি করে দুই পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওইদিন রাতেই সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাবের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান এক র‌্যাব সদস্য। পুলিশের হিসাবে গড়ে প্রতিদিন প্রায় দুজন করে পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হচ্ছেন অভিযান চালাতে গিয়ে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশৃঙ্খলার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সবশেষ গত শুক্রবার ভোরে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। যানবাহন তল্লাশির সময় একটি নম্বরবিহীন মোটরসাইকেলকে থামার সংকেত দিলে চালক লিয়ন পুলিশের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন। তিনি নিজেকে হালুয়াঘাট উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়কের ছেলে পরিচয় দিয়ে পুলিশকে হুমকি দেন এবং দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ সদস্যরা লিয়নের বাসার কাছাকাছি রাস্তায় দায়িত্ব পালন করতে গেলে তিনি ধারালো রামদা নিয়ে অতর্কিত হামলা চালান। অভিযুক্ত লিয়ন হালুয়াঘাট উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. রুহুল আমিনের ছেলে এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত। পরে অভিযুক্ত লিয়নকে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বাবার প্ররোচনায় লিয়ন কর্তব্যরত কনস্টেবল মো. ইজাউল হক ভূঁইয়াকে (এজাজ) লক্ষ্য করে পেছন থেকে কোপ দেন। এতে ওই পুলিশ সদস্যের পিঠে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরে সারা দেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে ৬০১টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে গত বছরের মার্চে, ৯৬টি। এছাড়া জানুয়ারিতে ৩৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭, এপ্রিলে ৫২, মে মাসে ৬২, জুনে ৪৪ পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। এছাড়া জুলাইয়ে ৩৯টি, আগস্টে ৫১, সেপ্টেম্বরে ৪৩, অক্টোবরে ৬৯, নভেম্বরে ৪১ ও ডিসেম্বরে ২৯টি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। দৈনিক গড় হিসাব করলে প্রতিদিন ১ দশমিক ৬ জন করে পুলিশ সদস্য অভিযান চালাতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। ছয় বছর আগেও বছরে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ছিল সাড়ে চারশ’র ঘরে। ২০২০ সালে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে ৪৪৯টি। পরের বছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৮টিতে। ২০২২ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমে ৬০১টিতে আসে। ২০২৩ সালে সারা দেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে ৬০৭টি। ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। সে সময় ৬৪৩ পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন।

১৮ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার থানাধীন ১ নং বাংলাবাজার ইউনিয়নের মৌলারপাড় এলাকায় পুলিশের ওপর দলবদ্ধভাবে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় দোয়ারাবাজার থানার এসআই মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। এর ঠিক একদিন আগে বগুড়ার ধুনট থানার ট্রাফিক উপপরিদর্শক (টিএসআই) আবুল কালাম আজাদের নির্দেশে থানার কনস্টেবল আবদুল খালেক ও আবদুল হামিদ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার হুকুম আলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি তল্লাশি চৌকি বসান। এ সময় একজন মোটরসাইকেল চালকের মাথায় হেলমেট না থাকায় মামলা দেন আবুল কালাম আজাদ। একই সময় অন্যদিক দিয়ে আসা একটি মোটরসাইকেল আটক করে কাগজপত্র সঠিক থাকায় চালককে ছেড়ে দেয়া হয়। এ সময় ১ হাজার টাকা ঘুস নেয়ার অভিযোগ তুলে দুই ব্যক্তি মব তৈরি করে অন্যদের সহযোগিতায় পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেন। এতে ওই দুই কনস্টেবল আহত হন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নামে পুলিশ। পরিবর্তন আনা হয় পোশাকেও। যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান হয়নি। উল্টো খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা দৈনন্দিন অপরাধে রূপ নিয়েছে। মব তৈরি করে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এখানে পুলিশের যে ভূমিকা নেয়া দরকার, তা নিতে দেখা যাচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আরো বেশি সংঘবদ্ধ হয়ে উঠেছে অপরাধীরা। এখান থেকে পুলিশকে বের করে আনার জন্য সবার আগে প্রয়োজন তাদের কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

হামলার ঘটনাগুলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশের ওপরে আক্রমণের ঘটনা গত এক বছরে অসংখ্যবার ঘটেছে। বিশেষ করে পুলিশ যেকোনো প্রেক্ষাপটে যখন আইনের প্রয়োগ ঘটাতে চেয়েছে, তখনই এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে। কাউকে মামলার আসামি করার ক্ষেত্রে পুলিশকে বাধ্য করা হয়েছে। একইভাবে এজাহার থেকে নাম বাদ দেয়ার জন্য পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি থানা থেকে আসামি ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের সহযোগিতা এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, সেটা পুলিশ পাচ্ছে না। উল্টো তাদের দোষারোপ করা, চাপ প্রয়োগ করে সুবিধা নেয়ার মতো উদাহরণও আছে। পুলিশ যখনই কারো অন্যায় আবদারে সাড়া দেয়নি, তখনই পুলিশের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, কিন্তু হয়েছে উল্টো। এতে করে পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রশ্নে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। যারাই এ ধরনের হামলা করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না।’

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এরপরও যারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আক্রান্ত করছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।’

আরও