চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি

বিদেশনির্ভরতায় দাম বেশি ভুট্টাবীজের, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ভুট্টার উৎপাদন হয়েছিল ২৭ লাখ ৫৯ হাজার টন।

অন্য ফসলের তুলনায় উচ্চ ফলন এবং বাজারে ভালো দাম থাকায় দেশে ক্রমাগত বাড়ছে ভুট্টার আবাদ। মানবখাদ্যের পাশাপাশি পোলট্রি, ডেইরি ও মাছ চাষের পরিধি বাড়ায় ভুট্টার চাহিদাও বাড়ছে। কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে প্রায় সাড়ে নয় লাখ টন। প্রবৃদ্ধির হার ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। দেশে ভুট্টার ক্রমাগত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আবাদ বাড়লেও শস্যটির বীজের প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশই আমদানি করা। বিদেশ থেকে আনায় এসব বীজের দাম বেশি। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বেশি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধান-আলুর তুলনায় ভুট্টায় তুলনামূলকভাবে কৃষকের লাভ বেশি। তাই কৃষক এখন এ শস্যে ঝুঁকছেন। সেজন্য বীজের বাজারও বড় হচ্ছে। স্থানীয় বীজের উৎপাদন পিছিয়ে থাকায় কৃষকের ইনপুট ব্যয় বাড়ছে। সেজন্য উৎপাদন বাড়াতে পারলে কৃষকের ব্যয় কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। তাদের মতে, দেশে উৎপাদিত বীজের দাম আমদানির চেয়ে সবসময়ই কম হয়। দেশে উৎপাদন করলে প্রতি কেজিতে ২০০ টাকা খরচ কমলে কৃষকের এক হেক্টরেই ৩-৪ হাজার টাকা ব্যয় কমে আসবে। এতে এ চাষে আগ্রহ বাড়বে কৃষকের।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ভুট্টার উৎপাদন হয়েছিল ২৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। আর কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৫-এর হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ভুট্টার উৎপাদন হয়েছে ৫৫ লাখ ৫ হাজার ৫৩৮ টন। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ভুট্টাবীজের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ২০০ টন। বিপরীতে বীজের সরবরাহ ছিল ৯ হাজার ৬৫৬ টন, যা চাহিদার ৬৮ শতাংশ। সরবরাহ করা বীজের মধ্যে সরকারি খাতের অবদান ৪১২ টন। আর বেসরকারি খাত সরবরাহ করে ৯ হাজার ২৪৪ টন।

বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ভুট্টার বীজই ব্যবহার হয়। সরবরাহ করা বীজের ৯০-৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) খুবই নগণ্য পরিমাণ বীজ উৎপাদন করে। দেশের বেসরকারি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করলেও চাহিদার মাত্র ৫-৭ শতাংশ এখান থেকে আসে।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিডব্লিউএমআরআই) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মোট ২৯টি ভুট্টার জাত রয়েছে। এর মধ্যে বিডব্লিউএমআরআইয়ের তিনটি হাইব্রিড জাত রয়েছে। বিডব্লিউএমআরআই-২ হেক্টরপ্রতি ১২-১৪ টন ফলন দেয় বলে সংস্থাটির দাবি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএডিসিও একটি হাইব্রিড ভুট্টা-৩ নামের জাত অবমুক্ত করেছে। এটির হেক্টরপ্রতি ফলন ১৪-১৬ টন বলে জানানো হয়েছে।

বিএডিসি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির ভুট্টার বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ টন। বিপরীতে তারা মাত্র ৭ দশমিক ৯৫ টন উৎপাদন করতে পেরেছে।

বাংলাদেশে বীজ বাজারজাতকারী বেসরকারি বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এসিআই। প্রতিষ্ঠানটি মৌসুমে ৮০০-৯০০ টন ভুট্টার বীজ বাজারজাত করে। বর্তমানে তারা ৩০০ টনের মতো ভুট্টাবীজ দেশে উৎপাদন করছে বলে জানিয়েছেন এসিআই এগ্রিবিজনেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এফএইচ আনসারী।

তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভুট্টাবীজের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করা হয়। এটি একটি বৈশ্বিক পণ্য। উন্নত জাত উদ্ভাবন ও মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো জার্মপ্লাজম। আমরা জার্ম প্লাজম এনে কিছু বীজ উৎপাদন করি। জার্মপ্লাজম উৎপাদনেও কাজ করছি। এটি হলে আশা করছি তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ভুট্টাবীজে একটি ভালো অবস্থান তৈরি হবে। আরো কিছু কোম্পানিও কাজ করছে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, জার্মপ্লাজম তৈরি ব্যয়বহুল। অনেক প্রতিষ্ঠান এখানে বড় বিনিয়োগ করেছে। ফলে কেউ জার্মপ্লাজম শেয়ার করে না। এজন্য এখন আমদানি করে বাজারজাত করা হচ্ছে।’

ভুট্টাসহ অন্যান্য বীজের বাজারে প্রভাব রয়েছে লাল-তীরের। প্রতিষ্ঠানটির এজিএম মোহাম্মদ খালেদ মোস্তফা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে গবেষণা কম। ফলে ভুট্টার নিজস্ব জাতও কম। জাতের ভিন্নতার জন্য বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। সেজন্য অন্যান্য বীজে বেসরকারি খাতের বড় অবদান থাকলেও এখানে এখনো কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। তবে দিনদিন সম্প্রসারিত হচ্ছে।’

তিনি দাবি করেন, ভুট্টা ও গম গবেষণা ইনস্টিটিউটের দেশীয় যে কয়েকটি জাত রয়েছে সেগুলোতে ময়েশ্চার বেশি থাকে। ওজন হ্রাস বেশি হয়। হারভেস্টের সময় ফলন বেশি দেখালেও শুকানোর পর ফলন কিছুটা কমে আসে। বিপরীতে আমদানি করা জাতগুলোর ময়েশ্চার তুলনামূলক কম হওয়ায় শুকালে ওজন হ্রাস কম হয়।

এ বিষয়ে বিডব্লিউএমআরআইয়ের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) ড. মো. মাহফুজ বাজ্জাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বারি ও আমাদের ২৯টি ভুট্টার জাত রয়েছে। এর মধ্যে আমাদের তিনটি হাইব্রিড জাত রয়েছে। যেগুলো আমদানি করা ভুট্টার জাতের সমান ফলন দেয়। আমাদের বিডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড ভুট্টা-২ জাতের ভুট্টা হেক্টরে ১২-১৪ টন ফলন দেয়। ফলন কম, এটি ঠিক না। তবে কালারে একটু ভিন্নতা আছে। আমাদের দানার রঙ কিছুটা হলুদ (ইয়েলো) ও আমদানিরটা কিছু কমলা (অরেঞ্জ)। ফলে কৃষক বিক্রি করার সময় আমদানি করা জাতের তুলনায় কিছুটা কম দাম পান বলে তথ্য আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্যারেন্ট ম্যাটেরিয়াল তৈরি করি। রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিএডিসি বীজ উৎপাদন করে। আমাদের বীজ উৎপাদনের সুযোগ নেই। আমরা গবেষণা করে জাত উদ্ভাবন করি। তবে পর্যাপ্ত জমি বরাদ্দ দিলে আর বীজ উৎপাদনের ভার দিলে আমরাও বীজ বাজারে আনতে সক্ষম।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দানার আকারের ওপর ভিত্তি প্রতি হেক্টরে ১৫-২২ কেজি পর্যন্ত ভুট্টাবীজের প্রয়োজন হয়। বিএডিসির উদ্ভাবিত হাইব্রিড জাতটির বিষয়ে প্রতি হেক্টরে ১৫-১৮ কেজি বীজ লাগে বলে উল্লেখ রয়েছে। সরকারিভাবে দেশে উৎপাদিত ভুট্টার বীজ চলতি মৌসুমে সাড়ে ৩০০ টাকায় কৃষক পর্যায়ে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ড. মাহফুজ বাজ্জাজ। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে আমদানি করা বীজ জাতভেদে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকারও রয়েছে।

বিডব্লিউএমআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, একরপ্রতি ভুট্টা চাষে কৃষকের খরচ হয় ৫৭ হাজার ৪৭০ টাকা। প্রতি একরে গড়ে ১৩০ মণ উৎপাদন ধরলে মণপ্রতি উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪০ টাকা। বিপরীতে প্রতি মণ গড়ে ৯০০ টাকা হিসাব করলে একরপ্রতি কৃষকের মোট লাভ থাকে ৫৯ হাজার ৫৩০ টাকা। আর প্রতি কেজি ভুট্টায় কৃষকের লাভ সাড়ে ১১ টাকা। অর্থাৎ বীজে ব্যয় কমলে কৃষকের মুনাফা আরো বাড়বে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএডিসি ধানসহ অন্যান্য শস্যের বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে ‍ভুট্টায় এখনো পিছিয়ে রয়েছে। শস্যের মধ্যে ধানের পর এখন ভুট্টা বেশি উৎপাদন হচ্ছে। বিএডিসি এখানে নিজেদের পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারলে এবং বীজ উৎপাদনে আরো প্রভাব তৈরি করতে পারলে তারাও লাভবান হবে, কৃষকও লাভবান হবে। কেননা সরকারি বীজের দাম কম হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসবে। আর আমদানিনির্ভরতা থাকলেও তো এমনিতেই দাম তুলনামূলক বেশি হয়। সেজন্য দেশীয় উৎপাদন ও গবেষণায় জোর দিতে হবে।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘দেশের ভুট্টাবীজের চাহিদার বেশির ভাগই আমদানি করা হয়। সরকারিভাবে কিছু উৎপাদন হচ্ছে তবে সেটি পরিমাণে অনেক কম। বেসরকারিভাবেও সরবরাহের বেশির ভাগই আমদানি করা। দেশে উৎপাদন বাড়াতে কাজ চলছে।’

আরও