আলোচনা সভায় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে অব্যাহত সংস্কার জরুরি

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘সংস্কার কোনো স্থির বিষয় না। এটা একটা অব্যাহত ও চলমান বিষয়।

যেকোনো অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে হলে মানবদেহের ভেতরে যেমন করে রক্ত সঞ্চালন দরকার, সংস্কার তেমনি একটি অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার জন্য দরকার।’

গতকাল সকালে রাজধানীতে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম বাংলাদেশ ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার ও গণমাধ্যমের প্রাসঙ্গিকতা’ আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, নিউএজের সম্পাদক নুরুল কবির, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য শামসুল হক জাহিদসহ অর্থনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘কেউ যদি মনে করেন বিগত সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কার প্রক্রিয়াও শেষ হয়ে গেছে বা তা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে—এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। বরং সংস্কারকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ।’

এ অর্থনীতিবিদের মতে, অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে ধারাবাহিকভাবে সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে। এ প্রক্রিয়া থেমে গেলে অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি দৃশ্যমান হয়েছে এবং এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামগ্রিক কাঠামোগত উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য। তাই আগামী দিনে সংস্কার কার্যক্রমকে আরো জোরদার ও ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যদি সেই অর্থে নীতিনির্ধারকের কথা বলতে হয়, তাহলে অবশ্যই সাইফুর রহমানের নাম বলতে হবে। সাইফুর রহমান সাহেবের যে সংস্কার তার ভেতরে দুটি সংস্কার ইতিহাসের পাতায় থাকবে। একটি হলো ভ্যাটের প্রচলন, আরেকটা হলো নমনীয় বিনিময় হারের প্রচলন।’

আলোচনা সভায় তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের প্রণীত প্রতিবেদনগুলোর এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।’ দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে রাজপথে থাকলেও ক্ষমতায় কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকায় বিষয়গুলো বুঝতে সময় নিচ্ছেন বলে জানান তিনি। পাশাপাশি তিনি দ্রুত গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তথ্য কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান।

বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘গণমাধ্যমের সব অংশীজনকে নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে মালিক পক্ষ, এডিটরস কাউন্সিল ও টেলিভিশন মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। ডিজিটাল যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে তথ্যের বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। একটি ডিভাইস দিয়েই এখন যে কেউ মতামত প্রকাশ করতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অতীতের তথ্য ব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান ব্যবস্থার বিশাল পার্থক্য রয়েছে।’

নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, ‘সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে তিন বছরের ট্র্যাকিং উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সাংবাদিকতার ভাষায় এ ট্র্যাকিং মূলত ফলোআপেরই একটি রূপ, যা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে প্রতিশ্রুতিগুলো এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কার জরুরি। এসব না হলে অর্থনৈতিক সংস্কারও টেকসই হবে না। গণমাধ্যমের ট্র্যাকিং, ফলোআপ, সমালোচনা ও প্রয়োজনে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্রিয়তা প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে যখন গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে উঠে আসা দাবিগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের প্রশ্ন আসে। গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতা করতে গেলে অনেক সময় বাধার মুখে পড়তে হয়।’ তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য শামসুল হক জাহিদ ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকলেও সেই প্রতিবেদনের একটি সুপারিশও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি—না আগের সরকার, না বর্তমান সরকারের মাধ্যমে।’

আরও