চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

অস্ত্রোপচারের সিরিয়াল পেতেই অপেক্ষা করতে হয় চার মাস

হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগের জেনারেল সার্জারিতে অন্তত ১২০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে গড়ে ৭০ জনের ছোট-বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করাতে চার মাস পর সিরিয়াল পেয়েছিলেন মো. মামুন। সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র খরচে অস্ত্রোপচারের সুযোগ থাকলেও এত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে চাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত বেশি টাকা খরচ করেই অস্ত্রোপচার করান বেসরকারি একটি হাসপাতালে। তার মতো চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা অনেক রোগীকেই একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

বন্দরনগরীর কোতোয়ালি থানাধীন আন্দরকিল্লায় অবস্থিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়লেও ১২৫ বছরের পুরনো ভবনে মাত্র দুটি অপারেশন থিয়েটার দিয়ে চলছে বিভিন্ন বিভাগের অস্ত্রোপচার। এর মধ্যে ওটির যন্ত্রপাতিও পুরনো। সক্ষমতার তুলনায় চাহিদা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় দীর্ঘ হচ্ছে তালিকা, সিরিয়াল পেতে রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে সাড়ে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত। ফলে অনেক রোগী জটিলতার কথা চিন্তা করে বাধ্য হচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতালে যেতে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের একটি অংশই কেবল বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করেন।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগের জেনারেল সার্জারিতে অন্তত ১২০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে গড়ে ৭০ জনের ছোট-বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। বিপরীতে সপ্তাহে সুযোগ রয়েছে গড়ে ৩০ জনের। ফলে অস্ত্রোপচারের চাহিদা ও সক্ষমতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে গত বুধবার সরজমিনে দেখা যায়, অপারেশন থিয়েটারের বাইরে রোগী ও স্বজনদের ভিড়। এদিন ইএনটি (নাক, কান, গলা) ও অর্থোপেডিক বিভাগের রোগীদের অস্ত্রোপচার চলছিল। হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা জানান, এ রোগীদের অনেকেরই সিরিয়াল নেয়া হয়েছিল মার্চ, এপ্রিল কিংবা মে মাসে। নির্ধারিত সময়ে কোনো কোনো রোগী অস্ত্রোপচার করাতে না আসায় অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে অন্য রোগীদের সিরিয়াল এগিয়ে আনা হচ্ছে।

কেবল সক্ষমতার স্বল্পতাই নয়, হাসপাতালটির পুরনো ওটির অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিও চিকিৎসকদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সাকিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওটির নানা সংকটের কারণে আমরা রোগীদের পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছি না। অপারেশন টেবিলের ওপরের লাইটটি অস্ত্রোপচারের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দিকে ঘোরাতে হয়। কিন্তু আমাদের ওটির লাইটটি এখন আর ঘোরানো যায় না। কয়েকটি দড়ি দিয়ে সেটি বেঁধে রাখা হয়েছে। একজন লোক দড়ি টেনে প্রয়োজন অনুযায়ী লাইটটি সরান। এতটাই অভিজ্ঞ হয়ে গেছেন যে তিনি না থাকলে অস্ত্রোপচার করাই কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে রোগীদের শতভাগ চিকিৎসাসেবা দেয়া যাবে?’ সম্পূর্ণ নতুন ওটি স্থাপন এবং চিকিৎসক নিয়োগ করা হলেই কেবল অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৭৬টি। এর মধ্যে সাধারণ সার্জারি ৪ হাজার ১৫১টি, ইএনটি ৯৪২, অর্থোসার্জারি ৮৯৬ এবং গাইনি অস্ত্রোপচার হয়েছে ১ হাজার ৪৯৭টি। এর আগের অর্থবছরে অস্ত্রোপচার হয়েছিল ৭ হাজার ৩৪৩টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬ হাজার ৫৮৯টি ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ১৮২টি অস্ত্রোপচার হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১২৫টি।

অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একই সময়ে রোগীর চাপও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২১-২২ অর্থবছরে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৬৪ জন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭১৮ জনে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে বহির্বিভাগের রোগী বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। জরুরি বিভাগেও রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। গত অর্থবছরে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১০ হাজার ৪৫ জন।

হাসপাতালে জেনারেল সার্জারি ছাড়াও পিত্তথলির পাথর, হার্নিয়া, পাইলস, বিভিন্ন ধরনের টিউমার, হাড়ভাঙা, নাক-কান-গলার জটিলতা, বিভিন্ন অর্থোসার্জারি, গাইনি, ব্রেস্ট, পাকস্থলীর ক্যান্সার ও লিভারের অস্ত্রোপচার করা হয়। ভর্তি রোগীদের জরুরি অস্ত্রোপচারও শিডিউল অনুযায়ী করা হয়। তবে জরুরি বিভাগে চিকিৎসক সংকটের কারণে সন্ধ্যার পর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ত্রোপচারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে যেসব রোগীর দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন, তাদের ক্ষেত্রে অপেক্ষার কারণে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ সিরিয়ালের কারণে রোগীরা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন। এতে তাদের চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যায়।

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায় ১২৫ বছরের পুরনো ভবনে দুটি মাত্র অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। ওটির যন্ত্রপাতিও অনেক পুরনো। প্রতিদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে যাদের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়, তাদের সিরিয়াল পেতে তিন থেকে চার মাসের বেশি সময় লাগছে। হাসপাতালে আরো সার্জন থাকলে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা বাড়ানো যেত। কিন্তু জায়গা ও ওটি সংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।’

পুরনো ভবনটি সংস্কার করে চালু রাখা গেলেও নতুন ভবন নির্মাণ জরুরি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে ঘোষিত হলেও সে অনুযায়ী জনবল নেই। বিভিন্ন বিভাগে সংযুক্তি দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। নতুন ওটি করার মতো জায়গাও নেই। হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ আট একর জায়গায় নতুন ভবন নির্মাণ করা গেলে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। এজন্য ৫০০ শয্যার নতুন হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

আরও