লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর এলাকায় থামছে না মেঘনার ভাঙন। নদীভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়ণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে উপকূলীয় এ দুই উপজেলাবাসীর।
ভাঙন ঠেকাতে নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে সরকারের দেয়া ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ কিছুটা স্বস্তি দিলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলায় কাজ বন্ধ রাখায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নিজেদের ভাগ্য নিয়ে শঙ্কিত রামগতি-কমলনগরের বাসিন্দারা।
এদিকে সরকারি বরাদ্দ দ্রুত বাস্তবায়ন দাবিতে সম্প্রতি নদীপাড়ে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অবশ্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসক বলেছেন, বালি সংকটে কাজ বন্ধ থাকলেও অচিরেই পুনরায় কাজ শুরু হবে।
জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মতিরহাট থেকে রামগতি পর্যন্ত ৩৭ কিলোমিটার মেঘনা নদীর তীর রয়েছে। গত ৩০ বছরে উপকূলীয় এ দুই উপজেলায় প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে নিঃস্ব হয়েছে হাজারো মানুষ।
গত বছরের জুনে লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলনগর উপজেলার বড়খেরী ও লুধুয়াবাজার এবং কাদিরপণ্ডিতেরহাট এলাকা ভাঙন থকে রক্ষাকল্পে মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত হয়েছে। ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। দ্রুত কাজ বাস্তবায়নে পুরো কাজকে ৯৯ প্যাকেজে ভাগ করে একই বছরের আগস্ট মাসে প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ২৭ প্যাকেজে ১৬ জন ঠিকাদারকে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ ভাগ করে দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৮ সিএফটি বালিভর্তি প্রায় ৬৬ লাখ বস্তা নদীতে ডাম্পিং করতে হবে। এরপর বাঁধ নির্মাণ করে তার ওপর কংক্রিটের ব্লক স্থাপন করতে হবে।
চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি কমলনগর উপজেলার সাহেবের হাট ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ওই কাজের উদ্বোধন করেন। এরই মধ্যে ১৩ জন ঠিকাদারই কাজ শুরু করেন। কিন্তু উদ্বোধনের পর পাঁচ মাসে যতটুকু কাজ হওয়ার কথা ছিল, তার আংশিকও সম্পন্ন হয়নি। এর পরিবর্তে দুই মাস ধরে কাজ বন্ধ রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ সময়ে মাত্র আড়াই লাখ বস্তা বালিভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে ডাম্পিং করা হয়েছে।
উপকূলের বাসিন্দারা জানান, এর আগেও রামগতি ও কমলনগর উপজেলার ভাঙন ঠেকাতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। এতে সেনাবাহিনী দ্বারা রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করায় রামগতি বাজার ও আলেকজান্ডারের সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা নদী ভাঙন থেকে রেহাই পায়। ওই প্রকল্পের কমলনগর উপজেলার মাতাব্বরহাট এলাকায় ঠিকাদার দ্বারা এক কিলোমিটার রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। অনিয়মের কারণে ওই রক্ষা বাঁধ আটবার ভাঙনসহ উপকূলীয় এলাকা প্রতিনিয়ত ভাঙনের কবলে রয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় একনেক সভায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। তাও উদ্বোধনের পরপরই বালি সংকটসহ নানা অজুহাতে বন্ধ রাখা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, একের পর এক তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ে
নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে। বিলীন হচ্ছে গাছপালা, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সরিয়ে অন্যত্র নিচ্ছেন নদীতীরের বাসিন্দারা। এ সময় নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধি দেখতে পাওয়া যায়নি।
আলাপকালে স্থানীয়রা জানান, সেনাবাহিনী দ্বারা নদীতীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। এখানে শুষ্ক মৌসুমেও নদীভাঙন অব্যাহত ছিল। অথচ বর্ষার আগেই পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা না হলে কমলনগর-রামগতির বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ দ্রুত বাস্তবায়নে বিভিন্ন দফতরে দফতরে ধর্ণা দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কমলনগরের লুধুয়া এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, মেঘনায় একে একে তিনবার বাড়ি ভেঙেছে। স্বামীর বাড়ি, বাপের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি বিলীন হয়েছে। বর্তমানে নদীর পাড়েই অন্যের জমিতে ঘর তুলে সন্তানদের নিয়ে থাকেন তিনি। সেটিও ভাঙনের মুখে। ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্টে দিনযাপন করেন। এবার ভাঙলে আর বাড়ির করার মতো সামর্থ্য নেই তার। একই কথা বললেন নদীপাড়ের বাসিন্দা মাহফুজ খাতুন ও রফিক উল্যাহ।
চলতি বছর এ প্রকল্পে ৬ কিলোমিটার কাজ করার কথা থাকলেও ২৭টি প্যাকেজে ৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে।
চাঁদপুরের বালি সংগ্রহে সমস্যার কারণে ডাম্পিং জিও ব্যাগ ডাম্পিং কাজ বন্ধ থাকার কথা স্বীকার করে লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ জানান, টাস্কফোর্সের পরীক্ষার ভিত্তিতে মানসম্মত বালি ফেলে দ্রুত কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এরই মধ্যে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। তাই এ বছর শুধু জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ করা হবে। আগামী বছর তীর রক্ষাবাঁধের কাজ করা হবে।
এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ জানান, মেঘনার ভাঙন রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। মানসম্মত বালিস্বল্পতার কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রেখেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কাজ শুরুর বিষয়ে কথা হয়েছে। অন্য জেলা থেকে মানসম্মত বালি এনে শিগগিরই তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।