চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ কমেছে ২৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এ সময়ে নিট এফডিআই এসেছে ৭৯ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ কমেছে প্রায় ৩০ কোটি ৯৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।
এফডিআইয়ের উপাদানভিত্তিক হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে নিট ইকুইটি ক্যাপিটাল বা নতুন মূলধন এসেছিল ৩৪ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৫৬ লাখ ৮০ হাজার ডলারে। একই সময়ে আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ ৬০ হাজার থেকে কমে হয়েছে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বিপরীতে পুনর্বিনিয়োগ করা আয় ৩৫ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার ডলারে।
বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসার পরিবেশ, জ্বালানি সরবরাহ ও নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে মনে করছেন দেশে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সংগঠনের নেতা ও প্রতিনিধিরা।
ফরেন ইনভেস্টর্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উপযুক্ত পরিবেশ দেয়া, যাতে তারা আবার বিনিয়োগ করতে পারেন। বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ না করলে নতুন এফডিআই আসবে না। সরকারের গৃহীত নিয়ন্ত্রক পরিবেশ ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে দেখলে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের পক্ষে শেয়ারহোল্ডারদের রাজি করিয়ে পুনর্বিনিয়োগ শুরু করা তুলনামূলক সহজ।’
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, জ্বালানি খাতে রাতারাতি উন্নতি সম্ভব নয়। তবে জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পূর্বানুমানযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও কৌশল থাকা জরুরি। এতে উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ে কাঁচামাল সংগ্রহ ও পণ্য উৎপাদন করতে পারে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিনিয়োগবান্ধব মনোভাব ও বাজেটে ইতিবাচক পরিবর্তন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন এখনো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করনীতি ও পদ্ধতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। তাদের দাবি, চলতি বছর রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর পুরনো পদ্ধতিতে নিয়ম মেনে চলা করদাতাদের আগের ১০ বছরের নথি যাচাই করে অতিরিক্ত করের চাপ তৈরি করছে। এফআইসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে খাতভিত্তিক শিল্পের আকার, রাজস্ব সম্ভাবনা ও কোম্পানির বাজার হিস্যা নির্ধারণে গবেষণা বিভাগ গঠনের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। বিনিয়োগকারীদের মতে, নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হলে নতুন বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে।
তবে বহুজাতিক কোম্পানির বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত সময়সাপেক্ষ বলে মনে করেন তারা। এসব কোম্পানির সামনে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিনিয়োগের সুযোগ থাকে। পূর্বানুমানযোগ্য নীতি, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ ও কম খরচের ভিত্তিতে তারা গন্তব্য নির্বাচন করে। সরকারের নীতিগত পরিবর্তন মাঠপর্যায়ে কার্যকর হলে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা পুনর্বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বাড়বে বলে প্রত্যাশা তাদের।
অন্যদিকে ইনভেস্ট বাংলাদেশ গতকাল প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা। তবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে নিট এফডিআই ছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। সে হিসাবে জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট প্রবাহ কমেছে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পুনর্বিনিয়োগ করা আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বেড়ে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নিট ইকুইটি মূলধন ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে হয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহও ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, ‘শুধু ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ২৮ শতাংশ পতনের সংখ্যাটি একা দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রথমার্ধের তুলনাটি মূলত ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের একটি অস্বাভাবিক উচ্চ ভিত্তির কারণে প্রভাবিত হয়েছে। ওই প্রান্তিকে নিট এফডিআই প্রায় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছিল এবং এর বড় অংশ এসেছিল ইন্ট্রা-কোম্পানি লোন থেকে যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। বাংলাদেশের এফডিআইয়ের ভিত্তি এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট। ফলে একটি বা দুটি বড় ট্রানজেকশনের টাইমিংয়ের কারণে প্রান্তিক বা অর্ধবার্ষিক হিসাবে বড় উত্থান-পতন দেখা খুবই স্বাভাবিক। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য কোনো একটি প্রান্তিকের সংখ্যা ব্যবস্থাপনা করা নয়; বরং বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে উন্নত করা।’
নাহিয়ান রহমান রচি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানির উচ্চ মূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ এখনো চ্যালেঞ্জিং।’ বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফায় প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতি আস্থার ইঙ্গিত দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে কাজ করছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পের উন্নয়নকাজ এগোচ্ছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এ অঞ্চল ঘিরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।