জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস আজ

জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক তথ্য নেই সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে

জন্ম ও মৃত্যুর সনদ—মৌলিক নাগরিক তথ্যের মধ্যে অন্যতম, যা নিবন্ধনের মাধ্যমে নিতে হয়। দেশে এ কার্যক্রম শুরু হয় ২০০১ সালে। তবে দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই নেই নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য।

জন্ম ও মৃত্যুর সনদ—মৌলিক নাগরিক তথ্যের মধ্যে অন্যতম, যা নিবন্ধনের মাধ্যমে নিতে হয়। দেশে এ কার্যক্রম শুরু হয় ২০০১ সালে। তবে দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই নেই নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য। এমনকি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনসংখ্যা সংক্রান্ত তথ্যও প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ জনমিতিক পরিসংখ্যানকে কেন্দ্র করেই নেয়া হয় দেশের প্রায় প্রতিটি আর্থসামাজিক কার্যক্রম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক তথ্য ছাড়া নীতিনির্ধারণ, বাজেট পরিকল্পনা বা জনসেবার কাঠামো—কোনো কিছুই নির্ভুলভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। তবুও এ মৌলিক তথ্য ব্যবস্থাপনায় রয়ে গেছে বিশৃঙ্খলা। এ বাস্তবতার মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস।

দেশের সব মানুষকে জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আনতে ২০০১ সালে ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহায়তায় প্রকল্প শুরু হয়। সে সময় হাতে লেখা জন্ম ও মৃত্যু সনদ দেয়া হতো। ২০০৪ সালে এ আইন স্থগিত করে ‘‌জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’ পাস করে সরকার। এটি কার্যকর হয় ২০০৬ সালের ৩ জুলাই। এরপর ২০১০ সালে সরকার অনলাইনে জন্মসনদ দেয়া শুরু করে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম রাজস্ব খাতে নিয়ে আসা হয়। এর পর থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিভাগ এ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। জনসচেতনতা বাড়াতে ২০১৮ সালের অক্টোবরে সরকার ৬ অক্টোবরকে ‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।

দেশে এখন পর্যন্ত যত জন্মনিবন্ধন হয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলোরই দ্বৈধতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন জন্ম নিবন্ধন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ কর্মকর্তা বলেন, ‘জন্ম নিবন্ধনের মোট সংখ্যাকে প্রকৃত নিবন্ধিত সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অনেকে একাধিক জায়গা থেকে জন্ম নিবন্ধন নিয়েছেন। তবে ধীরে ধীরে বিষয়গুলো কমিয়ে আনা হচ্ছে।’

দেশের নাগরিক সেবা এখন মিলছে অনলাইনে। সরকারি নথি ই-ডকুমেন্টে, এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টও ডাটাবেজের সঙ্গে যুক্ত। এর পরও এখন পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যার সঠিক তথ্য নিয়ে একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম তথ্য দিচ্ছে। বিবিএসের স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২৩-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার। সংস্থাটির ২০২৩ সালে প্রকাশিত তথ্য বলছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখ ৪১ হাজার ৩৩১ জন মৃত্যুবরণ করে। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৭ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৬ জন বা অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়েছে। ফলে ৩ লাখ ১০ হাজার ৩৯৫ জন বা প্রায় ৩০ শতাংশ মৃত ব্যক্তি মৃত্যু নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে।

যদিও এ সংখ্যাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। জন্ম কিংবা মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যেই নিবন্ধন সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে আইনে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল লাইব্রেরির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে শুধু সাড়ে ৪ শতাংশ শিশুর জন্ম নিবন্ধন এবং ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ মৃত্যুর নিবন্ধন সম্পন্ন হয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে শুধু ৫৪ শতাংশ শিশুর জন্ম নিবন্ধন হয়। ‘‌বার্থ অ্যান্ড ডেথ নোটিফিকেশনস ফর ইম্প্রুভিং সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ইন বাংলাদেশ: পাইলট এক্সপ্লোরেটরি স্টাডি’ শিরোনামে এ গবেষণা ২০২২ সালে প্রকাশিত হয়। যদিও বিবিএসের ২০২২ সালের এক পরিসংখ্যানে দাবি করা হয়েছে, মোট জনসংখ্যার ৬৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ জন্ম নিবন্ধনের আওতায় এসেছে।

দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয়, সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের পাশাপাশি বিদেশের বাংলাদেশী দূতাবাসে অনলাইনের মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশ ও দেশের বাইরে ৫ হাজার ৫৩২টি জায়গা থেকে জন্ম নিবন্ধন করা যাচ্ছে। আর এসবের হিসাব রাখছে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত জনসংখ্যার পরিমাণ ২২ কোটি ৮৮ লাখ ৮৬ হাজার ৬৬৫। আর নিবন্ধিত মৃত মানুষের সংখ্যা ৩১ লাখ ৩ হাজার ৪০৫। তবে এ পরিসংখ্যান হালনাগাদ নয় দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির অন্য একটি সূত্র বলছে, নিবন্ধনের সংখ্যা আগে কম থাকলেও এখন ক্রমে বাড়ছে। প্রতি বছর মৃত্যু নিবন্ধনের সংখ্যা ১০ লাখের কাছাকাছি।

বাংলাদেশে কোনো জরিপই সমন্বিতভাবে না হওয়ায় এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকায় এ ধরনের জটিলতা তৈরি হয় বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের জরিপগুলো নিয়মিত হয় না। একেকটা প্রতিষ্ঠান একেক সময়ে জরিপ করে। ফলে তাদের তথ্যে বড় গরমিল দেখা দেয়। তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও থাকে না। জনবল ও অর্থবলের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকা ও জরীপকৃত ফল তৈরিতে অনেক সময় দেরি হওয়ায় আমরা হালনাগাদ তথ্য পাই না। এছাড়া জনসংখ্যাবিষয়ক তথ্যগুলোরও অর্থনৈতিক অন্যান্য সূচকের মতো বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই।’

পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় আসা উচিত বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় বিভিন্ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করেও পরিসংখ্যান বের করা হয়। এ জায়গাগুলো বন্ধ করে যার যেটা কাজ সেটা করা উচিত। এর ফলে মানুষের মধ্যে দ্বিধা দূর হবে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও জরুরি।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কেবল একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি নাগরিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়। নাগরিক জীবনের প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভোটার নিবন্ধন, পাসপোর্ট, সম্পত্তি হস্তান্তর বা উত্তরাধিকার—সবকিছুর প্রথম শর্তই জন্ম নিবন্ধন সনদ। একইভাবে মৃত্যু নিবন্ধনও সামাজিক ও পরিসংখ্যানগত তথ্য ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর কারণ ও হার জানা গেলে জনস্বাস্থ্য নীতি, বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা আরো কার্যকর হয়।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত। এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন শতভাগ এবং মৃত্যু নিবন্ধন ৮০ শতাংশ করতে হবে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সিআরভিএস (সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস) দশক (২০১৫-২৪) ঘোষণা করা হয়েছিল। এতে বাংলাদেশের জন্য ২০২৪ সালের মধ্যে জন্মের এক বছরের মধ্যে শতভাগ জন্ম নিবন্ধন ও ৫০ শতাংশ মৃত্যু নিবন্ধনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার কোনোটাই এখনো অর্জন করা হয়নি।

তবে নিবন্ধনের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলে দাবি করেছেন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) মো. যাহিদ হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। চলতি বছরে এরই মধ্যে আমাদের প্রায় সাত লাখ মৃত লোকের নিবন্ধন করা হয়েছে। গত বছরও সংখ্যাটা প্রায় একই ছিল। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন উভয়ই আগের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে। আমরা ধীরে ধীরে সনাতনী পদ্ধতির নিবন্ধনগুলো বন্ধ করে দিচ্ছি। কারো দুইটা নিবন্ধন থাকলে অবশ্যই একটা ক্যানসেল করে আসতে হবে। প্রতি বছরই আমরা এ রকম প্রায় সাত-আট লাখ আবেদন গ্রহণ করছি। হয়তো চার-পাঁচ বছর পর গিয়ে সংখ্যাটা কাছাকাছি হয়ে আসবে। এছাড়া ২০২৪ সালে আমরা ৮৩ লাখ জন্ম নিবন্ধন করেছি। ২০২৫-এর এখন পর্যন্ত ৭৭ লাখ জন্ম নিবন্ধন করেছি। বছর শেষে হয়তো এক কোটি পেরিয়ে যাবে। অনেকেই হয়তো এখনো অনলাইন প্লাটফর্মে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি। জনগণের সহজলভ্যতার জন্য কারিগরি দিকটাও প্রতিনিয়ত হালনগাদ করছি আমরা।’

আরও