বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে জেন্ডার-সংবেদনশীল কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে সোমবার ( ১২ অক্টোবর) ঢাকায় ন্যাশনাল স্টেকহোল্ডার্স কনসালটেশন অন দ্য জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান ইন দ্য টেক্সটাইল সেক্টর অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো), পরিবেশ অধিদপ্তর (ডিওই) এবং প্রকল্প সহযোগীরা যৌথভাবে এ পরামর্শ সভার আয়োজন করে।
রিডিউসিং ইউজেস অ্যান্ড রিলিজেস অফ কেমিক্যালস অব কনসার্ন, ইনক্লুডিং পারসিস্টেন্ট অর্গানিক পলিউট্যান্টস, ইন দ্য টেক্সটাইলস সেক্টর শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে আয়োজিত এ সভায় সরকারি প্রতিনিধি, প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন। এতে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের লিঙ্গভিত্তিক চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বৃদ্ধি, কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যবহারিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশের টেক্সটাইল শ্রমশক্তির এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছেন নারীরা। কাজের দায়িত্ব, কেমিক্যাল এক্সপোজার, নিরাপত্তা তথ্যের অপ্রতুলতা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) এবং কর্মক্ষেত্রের প্রশিক্ষণের সুযোগের ভিন্নতার কারণে তারা বিশেষ কিছু পেশাগত ঝুঁকির সম্মুখীন হন। একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্ম পরিবেশ তৈরিতে জেন্ডার-সংবেদনশীল নীতি ও চর্চার মাধ্যমে এসব বৈষম্য দূর করা অত্যন্ত জরুরি বলে জানান বক্তারা।
পরামর্শ সভার মূল বিষয় ছিল জাতীয় জেন্ডার অ্যাসেসমেন্টের ফলাফল এবং খসড়া 'জাতীয় জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান' (এনজিএপি) উপস্থাপন। অংশগ্রহণকারীরা কেমিক্যাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য, উপযুক্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারী শ্রমিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
এ ছাড়া সভায় আঞ্চলিক জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি এবং টেক্সটাইল খাতে কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনায় জেন্ডারভিত্তিক বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হয়। খসড়া অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে কৌশলগত পদক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নজরদারি কাঠামো গঠনে অংশীজনদের কাছে মতামত আহ্বান করা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জাতীয় ফোকাল পয়েন্ট (এনএফপি) কাজী সুমন বলেন, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং ভিয়েতনামে বাস্তবায়িত এ আঞ্চলিক প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো টেক্সটাইল খাতে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবহার হ্রাস করা। এর অংশ হিসেবে ১২৫টি কারখানায় রাসায়নিক দ্রব্যের তালিকা তৈরির কাজ চলছে এবং প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দুটি কারখানায় বিকল্প ও নিরাপদ উপাদান ব্যবহার শুরু হয়েছে। টেক্সটাইল শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক নারী হলেও তারা কেমিক্যাল ঝুঁকির মুখে বেশি থাকেন।
জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়ক ড. মাহফুজুল হক বলেন, বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতে ৩০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের একটি বড় অংশ নারী। তারা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল ও পপসের মুখোমুখি হন, যা বিভিন্ন গবেষণায় নারী-পুরুষ উভয়ের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার বিসিআরসি-এসইএ’র পরিচালক ড. আন্তন পুরনোমো বলেন, আমাদের লক্ষ্য পুরো অঞ্চলজুড়ে ১০,০০০ সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো, যার মধ্যে ৬০% নারী। আমাদের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার হলো: জেন্ডার-সংবেদনশীল পেশাগত স্বাস্থ্য ও কেমিক্যাল নিরাপত্তা, নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও সময়সীমাভিত্তিক টেকসই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন।
জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশের সংগৃহীত ২৫টি টেক্সটাইল মিলের উপাত্ত অনুযায়ী শ্রমশক্তির ৪৮.৫% নারী। তবুও ডাইং ও ওয়াশিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশ (ওয়েট প্রসেসিং) এবং তদারকি বা ব্যবস্থাপনার ভূমিকায় তাদের উপস্থিতি বেশ কম। জেন্ডার-সংবেদনশীল কেমিক্যাল নিরাপত্তা কেবল মৌলিক কর্মক্ষেত্র সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এটি নারীদের নির্দিষ্ট ঝুঁকি মোকাবেলা, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত সুরক্ষা সরঞ্জামে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা নিশ্চিত করবে।
জাতীয় জেন্ডার বিশেষজ্ঞ মিস সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, জেন্ডার অ্যাসেসমেন্টে দেখা গেছে জেন্ডার-সংবেদনশীল ঝুঁকি মূল্যায়ন, পিপিই, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং জেন্ডারভিত্তিক উপাত্তের ঘাটতি রয়েছে। খসড়া 'জাতীয় জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান' একটি ব্যবহারিক কাঠামো প্রদান করে যেখানে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটি কার্যকর করতে সরকারি সংস্থা, কারখানা ও শ্রমিকদের যৌথ দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. সাইদুর রহমান বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩-এ টেক্সটাইল ডাইং ও ওয়াশিং সহ ১৩টি শিল্প খাতের জন্য ১৫টি রাসায়নিকের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু আইন প্রয়োগ করা নয়, বরং রাসায়নিকের ব্যবহার কমাতে শিল্পের সাথে যৌথভাবে কাজ করা। তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীকে ডাইং ও ওয়াশিংয়ের বর্জ্য দূষণ থেকে বাঁচাতে আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরকে বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল উভয় ধরনের ইটিপি চালু রাখার ওপর জোর দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
এসডোর সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার প্রফেসর ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, জেন্ডার বিষয়টিকে কেবল নারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সমতা ও ন্যায়ের দৃষ্টিতে দেখা উচিত, কারণ কেমিক্যাল ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া সব শ্রমিক ও কর্মীই এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত।
তিনি আরো ব্যাখ্যা করেন যে, প্রকল্পের লক্ষ্য কেমিক্যাল সম্পূর্ণ বন্ধ করা বা পিএফএএস সনাক্ত করা নয়, যার জন্য ল্যাব টেস্ট প্রয়োজন। বরং এর উদ্দেশ্য হলো বর্তমানে ব্যবহৃত কেমিক্যালের ব্যবহার বিশ্লেষণ করা এবং গ্রিন কেমিক্যালের দিকে ধাবিত হতে নির্বাচিত কারখানায় নিরাপদ বিকল্প উপাদানের পাইলটিং করা।
পরামর্শ সভার সমাপনী বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ও অনুষ্ঠানের সঞ্চালক পারভেজ চৌধুরী বলেন, টেক্সটাইল খাতের প্রায় অর্ধেক শ্রমিক নারী হলেও কেমিক্যাল-সংবেদনশীল কাজগুলোতে তাদের উপস্থিতি কম। সমাধান নারীদের বাদ দেয়া নয়, বরং প্রতিটি কর্মক্ষেত্রকে তাদের জন্য নিরাপদ করে তোলা।
এ পরামর্শ সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল জেন্ডারভিত্তিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার গণ্ডি পেরিয়ে স্পষ্ট দায়িত্ব, সময়সীমা ও নজরদারিসহ একটি বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রস্তাবিত অ্যাকশন প্ল্যানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণে নারী শ্রমিকদের সহজ প্রবেশাধিকার এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত উদ্যোগে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে এসডো এবং তার অংশীজনরা বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতে কেমিক্যাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি জেন্ডার-সংবেদনশীল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। কারণ শ্রমিকের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হলো একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই শিল্প উন্নয়নের মূল ভিত্তি।