ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শুরু

সংস্কারে নীতিগত ঐকমত্য জ্বালানি ব্যয়ে সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। আলোচনার অগ্রগতি ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা গতকাল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে শুরু হয়েছে। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ সভা। বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এতে অংশ নিচ্ছেন। প্রথম দিনে ভূরাজনীতি, বাড়তে থাকা ঋণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি সাইডলাইন বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নতুন ঋণ ও সংস্কার কার্যক্রম গুরুত্ব পেয়েছে।

উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। এরপর বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা, থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ড. একনিতি নিতিথানপ্রভাস, ব্যাংক অব থাইল্যান্ডের গভর্নর ভিতাই রতনাকর্ন ও কাসিকর্নব্যাংকের সিইও কাত্তিয়া ইন্দারাভিজায়া।

বিশ্বব্যাংকের ফ্ল্যাগশিপ সেশন ‘স্মল এআই বিগ জবস’-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। অজয় বাঙ্গা ও ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘‌উন্নত দেশগুলো এআইয়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে আছে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থান এআইয়ের কারণে প্রভাবিত হবে।’

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভাস্থলে গতকাল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জানান, জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং সংস্থাটি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জ্বালানিতে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে, তাই প্রয়োজনীয় আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।’

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। আলোচনার অগ্রগতি ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। তিনি আশা করেন, বিদ্যমান সহযোগিতার পাশাপাশি ভবিষ্যতেও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাশে থাকবে। নির্বাচনী ইশতাহারের লক্ষ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় নেয়া উদ্যোগের সামঞ্জস্য রাখার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

সোমবার সকালে ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।’

তার ভাষ্যে, সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের রূপরেখার সঙ্গে বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর সংস্কার প্রস্তাবের বেশকিছু মৌলিক বিষয়ে মিল রয়েছে। সংস্কারের মালিকানা রাজনৈতিক সরকার নেবে এবং সংস্কারগুলো টেকসই হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের পর জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার জ্বালানির দাম বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করেনি। আগের সরকারের সময় দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ আছে। এ অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়নে এ ধরনের কর্মসূচিতে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় তোলা হয়েছে।

নির্বাচনী ইশতাহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একাধিক উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগের কথা জানান অর্থ উপদেষ্টা। এর বড় অংশ আসবে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ থেকে। তার ভাষ্যমতে, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেছে। সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্লাগ অ্যান্ড প্লে ও প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এরই মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আগের সরকারের সময়কার অনিয়ম ও ঋণ-বিশৃঙ্খলার দায় এখন সাধারণ মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে পুনঃঅর্থায়ন প্রয়োজন। এ নিয়ে আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’

তার মতে, ব্যাংক খাত স্থিতিশীল না হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। কর অব্যাহতি ও কর-সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে রাজস্ব আহরণ কমে আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে, ফলে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়েছে বলেও তিনি জানান। বন্ধ কলকারখানা চালু ও নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে ৭ শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

বৈঠকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি থাইল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের। থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাত তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা। তিনি জানান, কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য ও হালাল খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে। আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলের মৌসুমে সরবরাহ বেশি থাকলেও হিমাগার ও প্রক্রিয়াকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়, কৃষকও ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির সুযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও আরসিইপি কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কৃষি, সামুদ্রিক যোগাযোগ ও বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ আহরণে সহযোগিতা বাড়াতে থাইল্যান্ডও আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান তিনি।

মূল আয়োজনের বাইরে সাইডলাইন বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য প্রাথমিক আলোচনাও শুরু করেছে। ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করতে আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আইএমএফের একটি মিশন বাংলাদেশ সফর করার কথা রয়েছে। ঋণ কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হলে এ বছরের শেষে কিংবা সামনের বছরের শুরুতে আইএমএফের পর্ষদে বাংলাদেশের নতুন ঋণ অনুমোদন পেতে পারে।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা গতকাল বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও অটোমেশনজনিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। থাই অর্থমন্ত্রী বহুপক্ষীয় সমন্বয় ও ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেন। ভিতাই রতনাকর্ন সাইবার নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল ফাইন্যান্স কাঠামো নিয়ে কথা বলেন। কাত্তিয়া ইন্দারাভিজায়া ক্ষুদ্র ব্যবসায় অর্থায়নে বেসরকারি খাতের ভূমিকার কথা বলেন।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় আট মাস ধরে চলা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে বিশ্বনেতারা উদ্বেগ জানান। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি সংকটের প্রভাব আলোচনায় উঠে আসে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ৪০০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সংকট নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আইএমএফ দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে এবং জ্বালানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর মতো কঠোর অভ্যন্তরীণ আর্থিক নীতি নিতে পরামর্শ দিয়েছে।

আরও