দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক জায়গায় এ বাড়তি দামেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়তি দামের জন্য খুচরা বিক্রেতা ও পরিবেশকরা সরবরাহ সংকটকে দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, চাহিদামতো এলপিজি সরবরাহ না পাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে অপারেটররা দাবি করেছেন, বাজারে এলপি গ্যাসের কোনো সংকট নেই। বাজারে এলপি গ্যাসের বাড়তি দাম নিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তুষ্টি তৈরি হয়েছে।
দেশের বাজারে চলতি মাসে (২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। যেখানে গত মাসে আমদানি ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টনের মতো। সে হিসেবে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার টন এলপিজি কম আমদানি হয়েছে।
শীর্ষ দুই এলপিজি অপারেটরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগস্টের তুলনায় চলতি মাসে ২৫-৩০ শতাংশ আমদানি কম হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতে পর্যাপ্ত কার্গো বা জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না এবং পরিবহন খরচও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের এলপিজি আমদানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন অপারেটররা।
চলতি মাসে ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘোষিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু বাজারে কোথাও এ দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। বরং এ সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ থেকে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত।
এলপিজির বাজার পরিস্থিতি, আমদানি ও মজুদ নিয়ে অপারেটরদের সঙ্গে গতকাল মতবিনিময় করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। ওই মতবিনিময়ে অপারেটররা জানান, দেশের বাজারে এলপিজির কোনো সংকট নেই। বরং সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
তবে বাজারে এলপিজির বাড়তি দামের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে পণ্যটির সরবরাহ সংকট। অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, দেশে এলপিজির আমদানি সংকট না থাকলেও কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করা হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যটির দাম বাড়ছে, ফলে মজুদের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিইআরসি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। নতুবা পণ্যটির দাম ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
ঢাকা শহরে এলপিজির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি দেখতে গতকাল এ প্রতিবেদক বেশ কয়েকটি স্থানে গিয়েছেন। বিক্রেতাদের কথায় মোটাদাগে সরবরাহ সংকটের বিষয়টি উঠে আসে।
মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যান এলাকার রাব্বি ইলেকট্রিক অ্যান্ড হার্ডওয়্যারের প্রোপ্রাইটার মিজানুর রহমান মিজান বণিক বার্তাকে বলেন, বাজারে সাপ্লাই কম থাকায় ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এ কারণে দাম কিছুটা বেড়েছে।
তিনি জানান, ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। আর সেটি এখন ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
মিরপুরের একজন এলপিজি ব্যবসায়ী জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে এলপিজির দাম ৩০০-৪০০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা অনুসারে গত মাসে ১৪টি অপারেটরের অনুকূলে এলপিজি আমদানির অনুমোদন ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার টনের মতো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন, যা চাহিদার চেয়েও বেশি। চলতি মাসে আমদানি অনুমোদন রয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টন, ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এলপিজি এসেছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। এ মাসে আরো বেশ কয়েকটি জাহাজ আসার কথা বলছেন অপারেটররা। তবে আগের মাসের তুলনায় আমদানি কমতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। সব মিলিয়ে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৪ টন এলপিজি এসেছে ।
দেশের বাজারে ৯৮ শতাংশ এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি অপারেটররা। আমদানি করা এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়িতে এবং ১২ শতাংশ শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। ৫ শতাংশ যানবাহনে ও অন্যান্য খাতে ৩ শতাংশ।
সরজিমন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, এলপিজি সংকটের কথা বলে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা। দাম কেন বেশি রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পরিবেশক ও ডিলারদের। আবার পরিবেশক ও ডিলাররা অভিযোগ করছেন, অপারেটরদের কাছ থেকে চাহিদা অনুসারে সরবরাহ পাচ্ছেন না তারা। সেই সঙ্গে এলপিজি পরিবহনে ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে পণ্যটির দামে। অপারেটররা বলছেন, তারা বিইআরসি নির্ধারিত দামেই বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছেন এবং বাজারে পণ্যটির পর্যাপ্ত সরবরাহও রয়েছে।
তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে অন্তত দুজন অপারেটর জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং লোহিত সাগরে প্রতিবন্ধকতায় বিশ্বব্যাপী এলপিজি সরবরাহ কমে গেছে। সেই সঙ্গে সিপি প্রাইস (এলপিজির প্রতি মাসে সৌদি ঘোষিত দাম) ফ্রেইট কস্ট ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যে পণ্য আমদানি করে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটেও কার্গোর দাম অনেক বেশি। এ কারণে অনেক অপারেটর আমদানি কিছুটা কমিয়েছেন। আগামীতে এ পরিস্থিতি বজায় থাকলে এবং রেগুলেটরি কমিশন এলপিজি আমদানিতে প্রিমিয়াম না বাড়ালে অনেক অপারেটর পণ্য আমদানি কমাতে পারেন। এরই মধ্যে বিইআরসিতে প্রিমিয়াম বাড়ানোর জন্য একটি অপারেটর আবেদন জানিয়েছে।
দেশে এলপিজি আমদানিতে বিইআরসি নির্ধারিত প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলার। যদিও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডেড প্রিমিয়াম ২৫০ থেকে বেড়ে ৪৫০ ডলার পর্যন্ত উঠে গেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রিমিয়াম না বাড়ানো হলে এলপিজি আমদানিতে সংকট তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন অপারেটরদের অনেকে।
দেশে এলপিজির ৫ শতাংশ ব্যবহার হয় অটোগ্যাস খাতে, যার পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার টন। সারা দেশে অটোগ্যাস স্টেশন রয়েছে ১ হাজার ১০০টির মতো। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ বর্তমানে বন্ধ। যেগুলো চলছে সেগুলোও কোনো রকম সরবরাহ নিয়ে টিকে আছে। কোনো কোনো স্টেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা অপারেটরদের কাছ থেকে চাহিদা অনুসারে সরবরাহ পাচ্ছেন না, যে কারণে স্টেশনগুলোতে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী সিরাজুল মাওলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি সংকটে দেশের ৭০ শতাংশ অটোগ্যাস স্টেশন বন্ধ। অটোগ্যাসের সরবরাহ চেয়ে আমরা দফায় দফায় চেষ্টা করেও নিশ্চয়তা পাচ্ছি না। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে বিইআরসিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে অটোগ্যাস খাত মুখ থুবড়ে পড়বে।’
দেশের বাজারে এলপিজি বাড়তি দামে বিক্রি ও সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেনি বিইআরসি। জানতে চাইলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে এলপিজির সংকট রয়েছে এটা আমরা শুনছি। তবে আমদানি যে কম হয়েছে সেটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। গত মাসে দেশে এলপিজি এসেছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। এ মাসে এখন পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টন। তবে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট থেকে এলপিজি আমদানিতে ফ্রেইট কস্ট বেড়েছে। আমরা এটা আগে কমিয়েছিলাম। এটা আমরা অবশ্যই বিবেচনা করব। এর বাইরে এলপিজি সাপ্লাই শর্টেজ অভ্যন্তরীণ কোনো কারণেও হতে পারে।’
দেশে এলপিজির সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, মজুদের বিষয়টি নিয়ে তথ্যপ্রমাণ ও অভিযোগ পাওয়া গেলেও বাজারে এলপিজির সংকট না থাকার বিষয়ে অপারেটররা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। গতকাল সচিবালয়ে এক মতবিনিময় সভায় অপারেটররা এলপিজি সংকট না হওয়ার নিশ্চয়তাও দিয়েছেন বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়। ওই সভায় জ্বালানিমন্ত্রী এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ, গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি না করা এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। সভায় অন্তত ৮-১০টি এলপিজি কোম্পানির মালিক ও কোম্পানি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
দেশের এলপিজি সেক্টরে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছে ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ইস্ট কোস্ট গ্রুপের সাবসিডিয়ারি। গ্রুপটির চেয়ারম্যান ও শিল্প উদ্যোক্তা আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে এলপিজির আমদানি সংকট রয়েছে বলে মনে করি না। তবে বিশ্ববাজারে প্রাইসিং নিয়ে যেহেতু বিইআরসি দাম সমন্বয় করে, ফলে অনেকেই মজুদ করার সুযোগ নিতে পারেন। যেটাকে আমরা কৃত্রিম সংকট বলতে পারি। অপারেটরা সবসময় চেষ্টা করে যাচ্ছেন দেশে যেন এলপিজির সংকট তৈরি না হয়।’
এলপিজি আমদানিতে অপারেটররা বরাবরই আন্তরিক। তার পরও দেশের বাজারে সংকট সৃষ্টি হলে কিংবা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হলে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে বলে মনে করেন এলপিজি সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি আমদানিতে আমরা কোনো সংকট দেখছি না। বাজারে যে সংকট তৈরি হচ্ছে তা অপারেটরদের পরের স্তরগুলোতে (পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা) হচ্ছে। এটা কৃত্রিম সংকট। এ সংকট দূর করার কাজ অপারেটরদের নয়, এটা মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে করতে হবে। বিইআরসিকে বিষয়টি তদারক করতে হবে। সেই সঙ্গে এলপিজি আমদানিতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে যেসব জটিলতা রয়েছে সেগুলো দূর করতে হবে।’