ঋতু পরিবর্তন ও তাপপ্রবাহের কারণে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, মাগুরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উপচে পড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে নির্ধারিত ওয়ার্ড ছাড়িয়ে বারান্দা ও মেঝেতে বিছানা পেতে শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। গরমের পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিং ও চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকরা অভিভাবকদের শিশুদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে সতর্ক থাকা ও আক্রান্ত হলে দ্রুত পরামর্শ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে জ্বরে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য ওয়ার্ডে ১০৫টি শয্যা রয়েছে। তবে সেখানে তিন শতাধিক শিশু জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি আছে। এদের মধ্যে অন্তত দেড়শ জন শুধু জ্বর নিয়ে ভর্তি। এছাড়া গড়ে প্রতিদিন নতুন আরো দেড় শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ৫৬ শয্যার বিপরীতে ৬৬ জন শিশু ভর্তি আছে, যার একটি বড় অংশ জ্বরে আক্রান্ত। মা ও শিশু হাসপাতালেও ৬০ শতাংশ শিশু জ্বর নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। সরকারি বিআইটিআইডি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ নগরীর বেসরকারি পার্কভিউ, সিএসসিআর, শেভরন, মেট্রোপলিটন, মেডিকেল সেন্টার, ল্যাবএইড, সাজিনা, সার্জিস্কোপ ও একুশে হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের অর্ধেকই জ্বরে আক্রান্ত বলে জানা গেছে।
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওয়ার্ডগুলোতে শিশুদের ভর্তি সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। আবহাওয়ার কারণে শিশুরা জ্বরে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। মোট ভর্তি হওয়া শিশুদের ৫০ শতাংশের বেশি শিশু কোনো না কোনোভাবে জ্বরে আক্রান্ত।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেক অভিভাবক ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়াচ্ছেন। এ রকম করা যাবে না। যদি শিশুর শরীরে তাপমাত্রা বেশি অনুভূত হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বহির্বিভাগে যারা চিকিৎসার জন্য আসছে, তাদের পরিস্থিতি বুঝে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসেন বণিক বার্তাকে জানান, জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে শয্যার তুলনায় শিশু রোগী ভর্তি বেশি। তবে যারা ভর্তি তাদের বেশির ভাগ জ্বরে আক্রান্ত। জ্বরের কারণে সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সাজেদুর রহমান জানান, শিশুরা এখন নানাবিধ সংক্রমণ জাতীয় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। হাম, ডেঙ্গুর পাশাপাশি জ্বরের প্রকোপ বেশি দেখতে পাচ্ছি আমরা। ঋতু পরিবর্তনে ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ বাড়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বেড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিতে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালেও ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। তাপপ্রবাহ ও পানিশূন্যতার কারণে শিশু ও প্রবীণরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালটিতে ৪০০-৪৫০ রোগী ভর্তি রয়েছে, যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। বহির্বিভাগে প্রতিদিন ১,০০০-১,২০০ রোগী সেবা নিচ্ছে।
শয্যা না পেয়ে রোগীরা ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা ও হাঁটার গলিতে তোশক বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ১৩০-১৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ৭০-৮০ জন শিশু ভর্তি আছে। এছাড়া ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপও দেখা গেছে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ও চিকিৎসকরা বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইন পানের পরামর্শ দিয়েছেন। শিশুদের ঘাম মুছে দেয়া ও সরাসরি অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পানি বা আইসক্রিম খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সেই সঙ্গে বাসি বা খোলা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মাগুরা জেলা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেও একই রকম চিত্র দেখা গেছে। ঠাণ্ডা, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর চাপে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। গত তিনদিনে প্রায় তিনশ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। শিশু ওয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ৪৫ জন হলেও সেখানে সবসময় দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকছে বলে জানা গেছে। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে মেঝেতে বিছানা পেতে শিশুদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং। বিদ্যুৎ চলে গেলে গরমে অসুস্থ শিশুরা অতিরিক্ত ঘেমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। রোগীর স্বজনরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
হাসপাতালের আরএমও মো. মামুন উর রশীদ বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালে চিকিৎসক, রোগী ও স্বজন সবাইকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। শিশু ওয়ার্ডে রোগীর ধারণক্ষমতা ৪৫ জন হলেও বর্তমানে সবসময় ২০০ জনের বেশি ভর্তি থাকছে।’
এছাড়া ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, নরসিংদী, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও রাজশাহীর হাসপাতালগুলোতেও জ্বর-ঠাণ্ডায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন প্রতিনিধিরা।