বাঁধ নির্মাণের পর নদীপাড়ের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলেন, এবার হয়তো আর বসতভিটা হারাতে হবে না। রক্ষা পাবে জীবনের শেষ সম্বল। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হতে শুরু করেছে মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই। প্রায় ৫২৮ কোটি টাকার এ স্থায়ী বাঁধের একটি অংশ পদ্মার প্রবল স্রোতে ধসে পড়েছে। সিসি ব্লক একের পর এক নদীতে বিলীন হওয়ায় এলাকাজুড়ে নতুন করে তীব্র ভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেকেই ঘরবাড়ি ও আসবাব সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন।
মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে স্থায়ী বাঁধে গত রোববার বিকালে হঠাৎ ধস দেখা দেয়। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ৩০ মিটার এলাকার বাঁধ বিলীন হয়ে যায়। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ব্লকগুলো পদ্মার স্রোতে তলিয়ে যেতে শুরু করে।
জানা গেছে, ২০২১ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকলেও পরে তা বাড়ানো হয়। ভেঙে পড়া অংশের বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে গত ২৫ মে।
সরজমিন গাঁওদিয়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, নদীপাড়ের পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রাত কাটাচ্ছেন। ভাঙনের ভয়ে অনেকেই ঘর ও প্রয়োজনীয় মালপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন,"‘রোববার বিকালে হঠাৎ বাঁধের ব্লকগুলো নদীতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। কোনো শব্দ ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।’ আরেক বাসিন্দা মো. সাগর বলেন, ‘বাঁধ ভেঙে যেতে দেখে আমরা রাতে আতঙ্কে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছি। এখন আমরা কোথায় থাকব, বুঝতে পারছি না।’
পদ্মার আগ্রাসনে লৌহজংয়ের এ অঞ্চলের মানুষ বহুবার সর্বস্ব হারিয়েছে। এ স্থায়ী বাঁধটিই ছিল তাদের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। কিন্তু দেড় মাসের মাথায় বাঁধের এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী আব্দুল লতিফ খান আক্ষেপ করে বলেন, ‘৩০ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারিয়েছি। বাঁধ হওয়ার পর ভেবেছিলাম এবার শান্তিতে ঘুমাতে পারব। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যেই যদি এ অবস্থা হয়, তবে আমরা যাব কোথায়?’ একই শঙ্কা প্রকাশ করে রিতা রাণী দে বলেন, ‘বাঁধ দেখে মনে হয়েছিল আর ভয় থাকবে না। এখন আবার মনে হচ্ছে সব হারানোর সময় এসেছে।’ মনির চন্দ্র দে নামের আরেকজন জানান, আগে অনেক জমি নদীতে গেছে। ভেবেছিলেন অন্তত থাকার জায়গাটা টিকবে, এখন সেটিও ঝুঁকিতে।
স্থায়ী বাঁধে এত দ্রুত ধস নামায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা ত্রুটি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যদি বাঁধের এ অবস্থা হয়, তাহলে সামনে নদীর পানি ও স্রোত আরো বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু জরুরি ভিত্তিতে ব্লক বসালেই হবে না; বাঁধের নকশা, নির্মাণকাজের মান ও ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত বিষয়ও যাচাই করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না হলে গাঁওদিয়া বাজারসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু। তিনি জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) জানানো হয়েছে। তারা ফাটল স্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুতি নিয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জ পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, ‘ভয়ের কোনো কারণ নেই। খবর পাওয়ার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে রয়েছেন। ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলাসহ সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।" তবে পদ্মায় পানি বাড়ায় স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি ও নদীর তীরের মাটি সরে যাওয়াকে তিনি ভাঙনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। নির্মাণকাজে কোনো ত্রুটি ছিল কিনা—এ প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে লৌহজং ছাড়াও মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বাংলাবাজার ও শিলই ইউনিয়ন এবং টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড় ইউনিয়নেও নতুন করে পদ্মার ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের কাটছে নির্ঘুম রাত। ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।