পাবনা মানসিক হাসপাতালে বন্ধ

বৃত্তি ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম রোগীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় জটিলতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিজোফ্রেনিয়া বা বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন।

দেশের অন্যতম বৃহৎ মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্র পাবনা মানসিক হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে বৃত্তিমূলক ও বিনোদনমূলক চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে রোগীদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফেরা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল এলাকায় মাদক সেবন ও অবৈধ বিনোদন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় রোগী ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মানসিক রোগীর চিকিৎসা শুধু ওষুধ কিংবা হাসপাতালে ভর্তি রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন রোগীকে সুস্থতার দিকে নিয়ে যাওয়া এবং তাকে দৈনন্দিন জীবনযাপন, সামাজিক যোগাযোগ ও কর্মজীবনে ফিরিয়ে নেয়াও চিকিৎসার অংশ। এ পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বৃত্তি ও বিনোদনমূলক চিকিৎসা।

জানা গেছে, বৃত্তিমূলক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে তার সক্ষমতা ও আগ্রহ অনুযায়ী কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এর উদ্দেশ্য শুধু রোগীকে ব্যস্ত রাখা নয়, বরং তার কাজ করার অভ্যাস, আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও স্বনির্ভরতা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু পাবনা মানসিক হাসপাতালে এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের দক্ষতা ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে বিনোদনমূলক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, গান, ছবি আঁকা, বই পড়া, চলচ্চিত্র প্রদর্শনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে একঘেয়েমি ও নিষ্ক্রিয়তা কমানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিজোফ্রেনিয়া বা বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন। সেলাই, হস্তশিল্প, মাটির কাজ, বাগান করা বা ছবি আঁকার মতো বৃত্তিমূলক কার্যক্রম রোগীর কর্মদক্ষতা তৈরিতে সাহায্য করে। একইভাবে লুডু, ক্যারাম, দাবা, ব্যাডমিন্টন বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড রোগীদের সামাজিক দক্ষতা ও দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলে।

এসব বিষয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আপাতত বন্ধ আছে। নতুন ভবন নির্মাণের পর এ কার্যক্রম আবার চালু করা হবে।’ তবে স্বল্প সময়ে সেবাগুলো চালুর কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপাতত এ কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে ভবন নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কিছু বিষয় জড়িত রয়েছে।’

মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক ও বিনোদনমূলক কার্যক্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একজন মানসিক রোগীর চিকিৎসায় ওষুধ যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার সামাজিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনাও গুরুত্বপূর্ণ। রোগী যখন সুস্থতার দিকে এগিয়ে যায়, তখন তাকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। এতে তিনি হাসপাতালে থাকাকালে কাজে ব্যস্ত থাকতে পারেন এবং বিনোদনের মাধ্যমে মানসিকভাবে ভালো থাকতে পারেন। এতে দ্রুত সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘চিকিৎসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ ধরনের কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং হাসপাতাল থেকে ফিরে পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারে। তাই শুধু ওষুধ বা সাইকোথেরাপি নয়, মানসিক রোগীদের পুনর্বাসনে বৃত্তিমূলক ও বিনোদনমূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা প্রয়োজন।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কার্যক্রম নিয়মিত না থাকলে রোগী হাসপাতালের পরিবেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। ফলে হাসপাতাল থেকে ছাড়ার পর পরিবার ও সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ১৯ জন কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে। তাদের মধ্যে তিন-চারজন গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত। সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো রোগের ক্ষেত্রে কোনো পর্যায়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ বাস্তবতায় যেসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তাদের শুধু চিকিৎসা দেয়া নয়; যথাসম্ভব পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজে ফিরিয়ে দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে পাবনা মানসিক হাসপাতাল এলাকার আরেকটি বড় সমস্যা হলো মাদক সেবন ও অবৈধ বিনোদন কেন্দ্র গড়ে ওঠার অভিযোগ। হাসপাতালের ভেতরের খোলা মাঠে প্রকাশ্যে নিয়মিত মাদক সেবন চলে। এছাড়া হাসপাতালকেন্দ্রিক অস্থায়ী পার্কের মতো পরিবেশ গড়ে ওঠায় রোগী ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। পাবনায় মাদকের সমস্যা ব্যাপক। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সম্মিলিতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছে। আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। আশা করি, বিষয়টির সমাধান হবে।’ হাসপাতালকেন্দ্রিক অবৈধ বিনোদন বন্ধের বিষয়েও তিনি কঠোর অবস্থান নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

আরও