ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সোয়া ২টা। ফার্মগেট ফুটওভার ব্রিজের নিচ পর্যন্ত চলে এসেছে কারওয়ান বাজারে পণ্য আনা ট্রাক ও পিকআপের দীর্ঘ সারি। সঙ্গে আছে পণ্য সংগ্রহ করতে আসা ভ্যানের জটলাও। এসব পাশ কাটিয়ে কারওয়ান বাজার সিগন্যালে পৌঁছতে সময় লাগল ১ ঘণ্টা ১৭ মিনিট। এ ৩০০ মিটার রাস্তা অতিক্রমের সময় কোনো ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের দেখা পাওয়া গেল না। এটা ছিল গত বুধবার রাতের চিত্র। এমন দৃশ্য শুধু এ সড়কে নয়, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, মগবাজার, মালিবাগ, রামপুরাসহ বেশ কয়েকটি এলাকার। ঢাকার ৬০০ ট্রাফিক পয়েন্টের মধ্যে রাত ২টার পরে মাত্র নয়টিতে দায়িত্ব পালন করে ট্রাফিক পুলিশ। বাকিগুলো চলে নিজের ইচ্ছেমতো। ফলে দিনের যানজট দীর্ঘ হচ্ছে রাতেও।
সরজমিনে রাজধানীর কয়েকটা এলাকার রাতের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঘুরে দেখা যায় তীব্র যানজটের চিত্র। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুর অন্যতম। এলাকাটিতে রয়েছে কৃষি মার্কেট নামের একটি কৃষিপণ্য বাজার। এটি বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মালিকানায় ১৯৭৮ সালে স্থাপিত হয়। মার্কেটের আয়তন পাঁচ একর। সারা দিন নিরিবিলি থাকা মার্কেট জেগে ওঠে রাতে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এ বাজারে পণ্য আনেন পাইকাররা। ট্রাক ও পিকআপে আনা পণ্য এ বাজার থেকে বিভিন্ন মহল্লার বাজারে চলে যায় ভ্যানযোগে। এর ঠিক পাশেই মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প। এ এলাকাও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততম হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে রাত যত বাড়ে মোহাম্মদপুরে যান চলাচলও বাড়তে থাকে। কিন্তু সে অনুযায়ী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতি রাতেই সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। ফুল, সবজিসহ নানা পণ্য আসে আগারগাঁওয়ের রাস্তা ধরে। বিশেষ করে মেট্রো স্টেশনের নিচে রাত ১২টার পরে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় যানজট অনেক সময় মাঝরাতও ছাড়িয়ে যায়।
রাজধানীর বাংলামোটরে রয়েছে বেশকিছু টাইলস ও গাড়ির যান্ত্রাংশের মার্কেট। এসব মার্কেটে পণ্য আসে রাতে। ফলে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে বাংলামোটর ও মগবাজার এলাকায় তৈরি হয় তীব্র যানজটের। এছাড়া মালিবাগ মোড় থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত সড়কটিতে সারা রাতই যানজট থাকে। পণ্যবাহী যানবাহন ও ঢাকার বাইর থেকে আসা বিভিন্ন গাড়ি এ সড়ক ব্যবহার করে। এছাড়া রামপুরা ব্রিজের পাশে গড়ে ওঠা বাঁশের দোকানগুলোর কার্যক্রমও রাতভর চলে। এসব দোকান ঘিরেও এলাকাটিতে তীব্র যানজট হয়। মিরপুর ও শাহআলী এলাকার কাঁচাবাজারসহ বেশকিছু বাজার রয়েছে। এসব বাজার মূলত রাতেই জমজমাট হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় ঢাকার প্রবেশমুখের সবচেয়ে নিকটবর্তী এ এলাকায়ও রাতভর যানজট থাকে। এছাড়া মাজার রোড দিয়ে বিভিন্ন গার্মেন্ট পণ্য আনা-নেয়ার কাজ করা হয়। এ এলাকার সড়কটিও রাত হলেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ট্রাফিক সদস্য না থাকায় যানবাহন চলে নিজ দায়িত্বে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৬০০ পয়েন্টে চার শিফটে ২৪ ঘণ্টার ট্রাফিক সেবা দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম শিফট চলে ভোর সাড়ে ৬টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত। এ সময় মোট ৬০০ পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। দ্বিতীয় শিফট শুরু হয় বেলা আড়াইটায়। চলে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। এ সময়েও ৬০০ পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। এরপর রাত সাড়ে ১০টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত তৃতীয় শিফট চলে। এ শিফটে ঢাকার ৩৮টি ব্যস্ততম পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। আর সর্বশেষ শিফট শুরু হয় রাত ২টায়। চলে ভোর সাড়ে ৬টা পর্যন্ত। এ শিফটে রাজধানীর মাত্র নয়টি পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। এ পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে গাবতলী বাস টার্মিনাল, শ্যামলী, কল্যাণপুর, মোহাম্মাদপুর বাসস্ট্যান্ড, মহাখালী বাস টার্মিনাল, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল, আজমপুর ও গুলিস্তান।
পরিবহনচালকদের ভাষ্যমতে, রাতে শুধু ঢাকার বাস টার্মিনাল এলাকাগুলোয় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। বাকি সব পয়েন্ট ফাঁকা থাকে। এসব পয়েন্টে চালকদের নিজ দায়িত্বে চলতে হয়। বিশেষ করে আসাদগেট, বিজয় সরণি এলাকাগুলোতেই রাতে সবচেয়ে বেশি যান চলাচল হয়। এছাড়া মালিবাগ থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত সড়কটিও রাতে ট্রাফিক পুলিশবিহীন অবস্থায় থাকে। এসব সড়কে চালকদের নিজ দায়িত্বে যানবাহন চালাতে হয়। অধিকাংশ সময় এলোমেলো যান চলাচলের কারণে এসব সড়কে তীব্র জটলা তৈরি হয়। কখনো কখনো স্থানীয়দের সহযোগিতায় কখনো আবার পরিবহন শ্রমিকদের সড়কের এসব জটলা ছাড়াতে হয়। এছাড়া পান্থপথ ও আরামবাগ এলাকা থেকে রাতে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে বাস ছেড়ে যায়। এ কারণে গভীর রাত পর্যন্ত এসব এলাকার সড়কগুলোতেও তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাতের ঢাকা বেশি ব্যস্ততম হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাজারকেন্দ্রিক এলাকাগুলো। এসব স্থানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচামাল নিয়ে আসেন পাইকাররা। এছাড়া রাতে ঢাকার ওপর দিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে ছেড়ে আসা যানবাহন চলাচল বেড়ে যায়। কিন্তু এসব এলাকায় রাতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা না থাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা হালনাগাদ করতে হবে। পুরনো দিনের মতো শুধু দিনকেন্দ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করলে হবে না। এখন প্রয়োজন রাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠা এলাকাগুলোর যান চলাচল নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা করার। না হলে রাতের ঢাকা দিনের চেয়েও স্থবির হয়ে থাকবে। রাজধানীকে গতিময় করে তোলার জন্য রাতের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিউটি বাড়াতে হবে। শুধু বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক এলাকাতেই নয়, বাজার এবং রাতে জমাজমাট থানা এলাকাগুলোতেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দিনের চেয়ে রাতে ঢাকায় যান চলাচল কমার কথা। কিন্তু রাত ১০টার পর থেকে ভারী যানবাহনগুলো চলতে থাকে। এ কারণে ঢাকার বেশকিছু পয়েন্টে যানজট সৃষ্টি হয়। উন্নত দেশে কিন্তু এত পয়েন্টে ট্রাফিক থাকে না। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ডিএমপির উচিত রাতের যানজটপ্রবণ স্থানগুলো নতুন করে চিহ্নিত করে সেসব স্থানে ট্রাফিক সদস্যদের ডিউটি বাড়ানো। না হলে রাতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনাও কমানো যাবে না। আমরা দেখেছি ঢাকায় যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, তার বেশির ভাগই রাতে হয়। রাতে সড়কে ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় শৃঙ্খলাও থাকে না।’
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় মূলত চার শিফটে দায়িত্ব পালন করা হয়। এর মধ্যে রাত সাড়ে ১০টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ ৩৮টি ইন্টারসেকশনে ট্রাফিক পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকেন। আর রাত ২টা থেকে ভোর পর্যন্ত নয়টি ইন্টারসেকশনে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। কর্মঘণ্টা যত সময়ই হোক না কেন যানজট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ট্রাফিক সদস্যরা সড়ক ছেড়ে যান না।’