এক দশকেও চালু হয়নি ফেনীর মঙ্গলকান্দি হাসপাতাল

ফেনীর সোনাগাজী ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে নির্মাণ করা হয় মঙ্গলকান্দি ২০ শয্যার হাসপাতাল।

ফেনীর সোনাগাজী ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে নির্মাণ করা হয় মঙ্গলকান্দি ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। এক দশক পার হলেও পুরোপুরি চালু হয়নি হাসপাতালটি। একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মকর্তা ও একজন পিয়ন ডেপুটেশনে কর্মরত রয়েছেন। তাদের দিয়ে বহির্বিভাগটি কোনো রকমে চালু রাখা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ক্লিনিকের চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা ঠিকমত হাসপাতালে আসছেন না। পিয়ন দিয়েই চলছে ওষুদের নাম লেখা, স্লিপ ও ওষুধ বিতরণের কাজ।

আবার ব্যবহার না হওয়ায় হাসপাতালের অবকাঠামো, আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এর কোনোটি কোনোটি হাসপাতাল নির্মাণের পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যবহার হয়নি।

হাসপাতালের মূল ভবনে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, নাছির উদ্দিন নামে এক অফিস সহায়ক বহির্বিভাগে রোগীদের স্লিপ লিখে দিচ্ছেন। বিনামূল্যে ওষুধও দিচ্ছেন। আবার কিছু রোগীকে স্লিপ দিয়ে ডাক্তার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অনুরোধ করছেন।

নাছির জানান, হাসপাতালে রেবেকা হক নামে একজন চিকিৎসক আছেন। তিনি সোনাগাজী হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। দেরিতে হলেও হাসপাতালে আসবেন। তাই জটিল রোগীদের স্লিপ দিয়ে অপেক্ষা করতে বলছি। যারা জ্বর, সর্দিসহ স্বাভাবিক সমস্যায় এসেছেন, তাদের সরকারি ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। এখানে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার থাকলেও তিনি ছুটিতে আছেন। তাই আমি বাকি কাজগুলো করছি।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে মির্জাপুরে ফেনী-সোনাগাজী সড়কের পূর্বপাশে তিন একর জমিতে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হয়। একই বছরের ১৮ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হলে চট্টগ্রামের মেসার্স রয়েল অ্যাসোসিয়েট অ্যান্ড দেশ উন্নয়ন লিমিডেট নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। ৫ কোটি ৯২ লাখ ৮৮৭ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হয় ভবন, ডরমিটরিসহ হাসপাতাল বিভিন্ন অবকাঠামো। ২০১৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল ভবন স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে। সেই থেকে ১০ বছর পার হলেও হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু হয়নি।

স্থানীয়রা বলছেন, হাসপাতালটি পুরোদমে চালু হলে সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দি, চর মজলিশপুর, বগাদানা, নবাবপুর ও চরদবেশসহ ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের দুই লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি সহজ হয়ে উঠতো। হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় নিরুপায় হয়ে এখনো তাদের সোনাগাজী অথবা ফেনী জেলা শহরে রোগী নিয়ে ছুটতে হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা উৎপল দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০ শয্যার হাসপাতালটি চালুর জন্য বারবার চিঠি দেয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এটি চালু করতে না পারলেও সেখানে বহির্বিভাগ খোলা রাখা হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মকর্তা ও একজন পিয়ন ডেপুটেশনে কর্মরত রয়েছেন। তবে মঙ্গলকান্দি হাসপাতালে দায়িত্বরত একজন চিকিৎসকের উপজেলা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার প্রশ্নই উঠে না। সেখানে কর্মরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আমার কাছে ছুটির আবেদন করেননি। আমি ছুটিও দেইনি। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

২০২০ সালে কভিড মহামারীর সময় তড়িগড়ি করে হাসপাতালটিকে আইসোলেশন কেন্দ্র করা হয়। ওই সময় সোনাগাজী উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে হাসপাতালে ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম চালু করা হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কিছু জনবলও দেয়া হয়। কিন্তু এতো আয়োজনের পরও হাসপাতালে কোনো রোগী ভর্তি হয়নি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, প্রতিষ্ঠার এতদিন পরেও হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু না হওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। জনবল পদায়নে সমস্যা থাকার কারণেই এটিকে পুরোদমে চালু করা যাচ্ছে না। 

ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালটি আমার উদ্যোগেই মঙ্গলকান্দিতে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ শেষে জনবল পদায়ন না করায় এটি চালু করা যাচ্ছে না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়। হাসপাতালটিতে জনবল অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। জনবল অনুমোদন, যন্ত্রপাতি স্থাপন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে এখানে শয্যা চালু করা হবে।’

সরজমিন দেখা গেছে, ফেনী-সোনাগাজী সড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে হাসপাতালের প্রধান ফটক। তার পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে হাসপাতালের চিকিৎসক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চারটি আবাসিক ভবন। হাসপাতালটিতে জনবল পদায়ন না হওয়ায় বৃহদায়তনের চিকিৎসক ডরমিটরিতে থাকেন মাত্র একজন চিকিৎসক। নার্স ডরমিটরিতে থাকেন ২-৩ জন। নির্মাণের পর থেকে তালাবদ্ধ রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মাণ করা আরো দুটি আবাসিক ভবন। ব্যবহার না হওয়ায় ভবনগুলোর দরজা, জানালা এবং জানালার কাঁচ ভেঙে পড়েছে অনেক আগে। অনেকটা পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনগুলো। একই অবস্থায় পড়ে আছে হাসপাতালের গার্ড রুম, গ্যারেজ ও অন্যান্য স্থাপনা।

এ বিষয়ে ফেনী সিভিল সার্জন ডা. সিহাব উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০ শয্যার মঙ্গলকান্দি হাসপতালটি চালুর জন্য বারবার দপ্তরে চিঠি দেয়া হয়েছে। চেষ্টা তদবিরের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি পরিদর্শন করে গেছে। তারপরও জনবল পদায়ন করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় তিনজনকে সেখানে ডেপুটেশনে দিয়ে বহির্বিভাগ চালু রাখা হয়েছে। তবে যারা সেখানে দায়িত্ব নিয়ে অনুপস্থিত থাকেন; তাদের কারণ দর্শানো হবে। এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’

আরও