আব্দুল হাই সরকার। ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান পদেও রয়েছেন। তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে দেশের অন্যতম কনগ্লোমারেট পূর্বাণী গ্রুপের। সফল এ উদ্যোক্তা জ্বালানি-ব্যাংক খাতসহ দেশের অর্থনীতির নানা সংকট নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার অন্তর্দৃষ্টিতে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমামূল হাছান আদনান
দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?
অর্থনীতি এখন একটি বিশেষ পর্যায় বা চলমান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাত—সব পক্ষকেই একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। অর্থনীতিকে কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায় এবং বেসরকারি খাতকে কীভাবে এর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানো যায়, সরকারও সে বিষয়ে যথেষ্ট চেষ্টা করছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই অর্থনীতিতে অনেকগুলো সমস্যা ছিল। এর মধ্যে কিছু সমস্যা অন্তর্বর্তী সরকার রেখে গেছে, যেগুলোর কিছু হয়তো এ মুহূর্তে না করলেও চলত। যেমন- সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল। এ খাতে ব্যয় বাড়ানোর আগে সরকারকে সেই অর্থ আয় করতে হবে। কিন্তু রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার শুরু থেকেই কিছু বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এসব বাধা মোকাবেলা করে সামনে কতটা এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর।
এ সরকারের কাছে আপনাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। সরকার কি সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী পথ চলছে বলে মনে হয়?
এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা কিছুটা মুশকিল। মাত্র তো ছয় মাস পার হয়েছে। তাছাড়া নতুন সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন দেশের কোনো অর্থনৈতিক সূচকই ভালো অবস্থায় ছিল না। সব সূচককে কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেই বিশেষ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আর পুরো বিষয়টিকে সমন্বিত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কোনো দূরত্ব তৈরি হলে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে কোথাও কোনো দূরত্ব রাখা যাবে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট। একজন অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা হিসেবে এ সংকটকে কীভাবে দেখছেন?
এ সংকট তো আগে থেকেই ছিল। আগের সরকার এ বিষয়ে আরেকটু সক্রিয় হয়ে সমাধান করতে পারত। কিন্তু তারা কিছুই করেনি। দেশের ভেতরে সমাধান বের করা সম্ভব হলেও তারা মূলত বাইরে থেকে গ্যাস-বিদ্যুৎ আমদানিতেই ব্যস্ত ছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারও এ সমস্যায় সেভাবে হাত দেয়নি।
দেশে গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে তৈরি পোশাক খাত। সংকটের এ সময়ে আপনারা কীভাবে কারখানা পরিচালনা করছেন?
পাইপলাইনে গ্যাস পাওয়াই যাচ্ছে না। ফলে এখন আমাদের বিকল্প উপায়ে বেশি দামে বা অতিরিক্ত খরচে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। সরকারি মূল্যের তুলনায় প্রায় তিন-চার গুণ বেশি দামে গ্যাস সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছি। ভোলা থেকে ট্যাংকারের মাধ্যমে গ্যাস এনে কারখানা সচল রাখছি। এতে ব্যয় অনেক বাড়ছে। তবে সমস্যা হলো চাহিদার তুলনায় দেশে গ্যাস পরিবহনের ট্যাংকারের সংখ্যাও অনেক কম।
সমস্যা হলো আমাদের দেশে অংশীজনদের কথা খুব একটা শোনা হয় না। অনেক সময় ওপর থেকে নীতি চাপিয়ে দেয়া হয়। এ চাপিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি আমাদের ত্যাগ করতে হবে। কারণ দিন শেষে এসব নীতি বাস্তবায়ন করবেন ব্যবসায়ীরাই। কাজেই কোন নীতি কতটা ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সে বিষয়ে আগে থেকেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হলে এর বাস্তবায়ন আরো সুন্দর ও কার্যকর হবে।
আপনি বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ীদের একজন। জ্বালানি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারের এ মুহূর্তে কী করা উচিত বলে মনে করেন। আর দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন?
অগ্রগতি অর্জন করতে চাইলে ভালো অবকাঠামো ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেও এখন সব ধরনের উদ্যোগই নানা প্রতিকূলতা ও বাধার মুখে পড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ তো আগে থেকেই রয়েছে। এসব আন্তর্জাতিক বাধা অতিক্রম করা এমনিতেই কঠিন। তবে তাই বলে বসে থাকা যাবে না। অনেক কারখানা থাকলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকলে সেগুলো মৃত ঘোড়ার মতো অকার্যকর অবস্থায় পড়ে থাকবে। একজন মানুষের যেমন কঙ্কাল বা আত্মা ছাড়া শরীর চলে না, জ্বালানিও অর্থনীতির জন্য ঠিক তেমনই। এ কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সম্মিলিত সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা থাকা দরকার।
আমাদের কিছু প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে। যেমন ভোলায় গ্যাস থাকলেও তা পরিবহন করে আনার সক্ষমতা আমাদের নেই। অথচ আমাদের কারখানাগুলোতে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন। সত্যিকার অর্থে শিল্প খাতকে সচল রাখতে চাইলে ভোলায় বিদ্যমান গ্যাস দ্রুত আনার সুব্যবস্থা করতে হবে। কীভাবে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো যায়, সে বিষয়ে সরকারের অনতিবিলম্বে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি করা গেলে শিল্প খাত অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পেতে পারে। আবার আমাদের ভেসেল বা ক্যারিয়ারেরও তীব্র অভাব রয়েছে। মেরিটাইম রুটে সাগরপথে জ্বালানি পরিবহনের জন্য অনেক ভালো মানের বিশেষায়িত কার্গো প্রয়োজন, যা আমাদের দেশে নেই।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যাংক খাতের নেতৃত্বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ খাতে আগে যে সংকট বা অনিয়ম-দুর্নীতি ছিল, সেখান থেকে কি আমরা বেরিয়ে আসতে পেরেছি?
সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, ব্যাংক খাত খুব ভালো অবস্থায় আছে—এখনো এটা বলা যাবে না। তবে ঢাকা ব্যাংকের মতো কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক মোটামুটি ভালো ও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। অতীতে যারা ব্যাংকে এসে নানা অনিয়ম করেছে, তারা সব ব্যাংককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি। দুই-চারটি ব্যাংক হয়তো কোনোভাবে প্রভাবিত হয়েছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যারা অনিয়ম করেছে, তারা নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েছে এবং নিজেদের ব্যাংকের টাকা নিজেরাই চুরি করে নিয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় যেসব ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, সেখানেও নীতিগত ভুল ছিল। রাজনৈতিক বিবেচনায় পাওয়া এসব ব্যাংকই এখন পুরো অর্থনীতিকে ভোগাচ্ছে। এর পরোক্ষ ভুক্তভোগী আমরা সবাই। এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে সব ব্যাংকই বুঝি অনিয়মে জড়িত।
তবে ব্যাংকের পর্ষদ ও পরিচালকদের পক্ষ থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। এরপরও অতীতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে। সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হচ্ছে। পাশাপাশি আমরাও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা অনুসরণ করে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি।
এখনো অভিযোগ আসছে যে কোনো কোনো ব্যাংকের পরিচালকরা পর্ষদ সভার ফি ১০ হাজার টাকার পরিবর্তে লাখ টাকা নিচ্ছেন। সিএসআরের অর্থ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছেন। এগুলোর ক্ষেত্রে বিএবি কোনো উদ্যোগ নিতে পারে কিনা?
আমি মনে করি, পরিচালকদের খাওয়া-পরার জন্য ব্যাংকের এ সামান্য টাকারও প্রয়োজন নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কোনো চর্চা হঠাৎ করে একেবারে বন্ধ করে দিলে অনিয়ম আরো বাড়তে পারে। বরং এমন ব্যবস্থা নেয়া উচিত, যাতে এসব অনিয়ম ধীরে ধীরে বন্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আমরা যখন ঢাকা ব্যাংক শুরু করি, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এতটা কঠোর ছিল না। সে সময় আমরা উদ্যোক্তারা নিজেরাই সৎ ছিলাম এবং নিজেদের উদ্যোগে ব্যাংককে ভালোভাবে এগিয়ে নিয়েছি। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাও ধীরে ধীরে কঠোর হচ্ছে। পরিচালকদের এসব বিষয়েও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।
আপনি বলছেন ব্যাংক খাতে এখন ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে। স্ট্রেসড বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের হিসাব করলে এর পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগগুলো কার্যকর হচ্ছে না কেন?
কিছু লোক তো এমন আছে, যার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। আর যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, তারাও আইনি ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। তারা আদালতে গিয়ে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে দিল, আর অমনি ছয় মাস বা এক বছর নিশ্চিন্তে রইল—কোনো ঝামেলা নেই। মামলা ঝুলে থাকার কারণে ব্যাংকও টাকা আদায় করতে পারে না।
এজন্য রিট করার সুযোগ সীমিত করা উচিত। একজন গ্রাহক হয়তো যৌক্তিক কারণে একবার রিট করতে পারেন। কিন্তু বারবার রিট করে আদালতে মামলা ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ বন্ধ করা দরকার। কারণ ব্যাংকের পক্ষে আদালতে যাওয়ার আগেও অনেক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
সম্প্রতি বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই জমি কেনা এবং ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করেন। ফলে মূল কারখানা চালু হওয়ার পর তারা চলতি মূলধনের সংকটে পড়েন। এ প্রবণতা থেকে বের হওয়ার উপায় কী?
আপনি শিল্প-কারখানা করবেন, কিন্তু জমি কেনার টাকা নেই। পুরো অর্থ ব্যাংক থেকে নিয়ে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করবেন বা টাকা পাচার করবেন—ব্যাংকের এমন সুযোগ দেয়া উচিত নয়। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার নিজস্ব অর্থায়ন বা ‘ডেট-ইকুইটি ফাইন্যান্সিং’ কতটা শক্তিশালী, তা দেখা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
সরকারি ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সরকারি ব্যাংকগুলোতে জনগণের অর্থের যে অপচয় হচ্ছে, তা বন্ধ করা জরুরি। অনেক সরকারি ব্যাংকের ৭০-৮০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। এটা মেনে নেয়া যায় না। সরকারের দায়িত্ব হলো জরুরি ভিত্তিতে এ অপচয়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বলা হচ্ছে, বেসরকারি ব্যাংকের অর্ধেক পরিচালক স্বতন্ত্র হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে। তো স্বতন্ত্র পরিচালকরা যদি এতই সৎ ও যোগ্য হয়, তাহলে তাদের সরকারি ব্যাংকেই নিয়োগ দেয়া হোক। তাতে এ ব্যাংকগুলো ঠিক হবে। অবশ্য সরকারি ব্যাংকের পরিচালক তো সরকারই নিয়োগ দেয়। তাহলে এসব ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি হলো কেন?
যেসব সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের অবস্থা একেবারেই নাজুক, সেগুলোর জন্য আপনার পরামর্শ কী?
সরকারের অনেক অর্থনীতিবিদ আছেন, তারা বিষয়টি ভালো জানেন। তবে নতুন পরিচালক নিয়োগ দিলেই যে তারা রাতারাতি ফেরেশতা হয়ে সবকিছু ঠিক করে ফেলবেন, তা নয়। এরপরও ভালো ও সৎ মানুষকে সেখানে আনা দরকার। ব্যবসায়িক ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এমন প্রকৃত উদ্যোক্তারা কখনই একটি ব্যাংক ধ্বংস হতে দেবেন না। কিন্তু আপনি যদি শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে, কোনো পেশাগত বা ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ছাড়াই কাউকে ব্যাংকের পরিচালক বানিয়ে দেন, তাহলে সে ব্যাংকের ক্ষতি করবেই।