সমন্বিত নীতিমালা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা সম্ভব নয়

—ম. তামিম,

উপাচার্য ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতিমালা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা দরকার।

একক প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বরং নবায়নযোগ্য শক্তি, কয়লা ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে একটি টেকসই রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। দেশে প্রাথমিক জ্বালানির তীব্র ঘাটতি এবং নিজস্ব গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসার কারণেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। অতীতে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধারাবাহিকভাবে যে অবহেলা করা হয়েছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন।

বাংলাদেশে শতভাগ জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জন বাস্তবসম্মত নয়। তবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। দেশে অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্ব ও জমির তীব্র সংকটের কারণে বাসাবাড়ির ছাদে (রুফটপ সোলার) সৌর প্যানেল বসিয়ে বড় আকারের বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। ফলে কলকারখানার ছাদ ও সরকারি অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে বড় আকারের ‘সোলার পার্ক’ গড়ে তুলতে হবে।

নীতি বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও এনবিআরের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। সরকারের পক্ষ থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে করছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। রামপালে ১ হাজার ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও সেখানে ৮০০ একর জমি পড়ে আছে। সরকার যদি এসব জমিতে অবকাঠামো তৈরি করে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ মডেলে বিনিয়োগকারীদের সুযোগ দেয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

দেশে শীত ও গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদায় প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াটের বড় ব্যবধান থাকে। ফলে শীতকালের চার মাস বহু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস বসিয়ে রাখতে হয়। এতে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট গুনতে হয়। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা দরকার। অদক্ষ যন্ত্রপাতির জায়গায় ‘ইনভার্টার’ প্রযুক্তিযুক্ত এসি, রেফ্রিজারেটর এবং সাশ্রয়ী ফ্যান ও মোটরের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এজন্য নীতিগত সহায়তার অংশ হিসেবে অদক্ষ যন্ত্রপাতির ওপর কর বাড়িয়ে শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ওপর রাজস্ব ছাড় দেয়া উচিত।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে দিয়েছে। একক কোনো অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত না হতে পারলে দেশে নবায়নযোগ্য শক্তির সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কঠিন হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল জরুরি মুহূর্তে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব।

কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং বেসলোড বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। তবে সরকার পরিবর্তন হলেও যেন জাতীয় জ্বালানি নীতি পরিবর্তন না হয়—সেজন্য একটি সর্বসম্মত রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। সংকট কাটাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে বসে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের উপযুক্ত রূপরেখা তৈরি করা দরকার।

আরও