তুরাগের তলদেশে ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনে ঢুকেছে পানি

এলপিজি ভোগান্তির মধ্যেই ঢাকায় তীব্র গ্যাস সংকট

দেশে গ্যাস ও এলপিজি সংকটের মধ্যেই এবার তুরাগ নদের তলদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাইপলাইন। মালবাহী ট্রলারের আঘাতে গত বুধবার এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট।

দেশে গ্যাস ও এলপিজি সংকটের মধ্যেই এবার তুরাগ নদের তলদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাইপলাইন। মালবাহী ট্রলারের আঘাতে গত বুধবার এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। পরে এটি মেরামতকালে সঞ্চালন লাইনে পানি প্রবেশ করে। এতে নতুন করে সংকট তৈরি হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে গ্যাসের চাপ। কোথাও কোথাও একেবারেই গ্যাস নেই। বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ পিএসআই চাপের পাইপলাইনটি দিয়ে রাজধানীর উত্তর ও পশ্চিমাংশের একটি বড় অংশে গ্যাস সরবরাহ হয়। এর আওতায় রয়েছে উত্তরা, টঙ্গী, মিরপুর, পল্লবী, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, আদাবর, সাভার ও আশুলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। এসব অঞ্চলের বহু আবাসিক ভবন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ছোট কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করেই গ্যাসহীন হয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাইপলাইনে সমস্যা দেখা দেয়ার পর উত্তরা, মিরপুর, মহাখালী, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। কোথাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় গ্যাস সরবরাহ। এতে বিপাকে পড়েছেন গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলোয় এলপিজির ওপর নির্ভর করে কাজ চালাতে হচ্ছে। কিন্তু বাজারে এলপিজির দাম আগেই বেড়ে যাওয়ায় সেই বিকল্প ব্যবস্থাটিও অনেকের নাগালের বাইরে।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, ‘বাসায় গ্যাস নেই। বেশি দাম দিয়েও মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। তাই রান্না করা যাচ্ছে না। বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতে হচ্ছে, এতে ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েক গুণ।’

একই পরিস্থিতির কথা জানান মিরপুর সাড়ে ১১-এর বাসিন্দা আলতাফ হোসেন। স্বামী-স্ত্রী কর্মজীবী হওয়ায় খুব ভোরে রান্নার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে অফিসে যান দুজনই। কিন্তু গত কয়েকদিন গ্যাস সংকট থাকায় চুলাই জ্বালাতে পারছেন না। বিকল্প উপায় হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা কিনে বাসায় খাবার তৈরি করছেন। তাতে অনেক বেশি সময় লাগছে।

কী কারণে গ্যাসের এ তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে তা অনেক এলাকার বাসিন্দাদের অজানা। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল) গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে আমিনবাজারে তুরাগ নদের তলদেশে ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাস পাইপলাইনটি মেরামত করা হয়েছে। তবে মেরামতের সময় পাইপে পানি প্রবেশ করায় ঢাকা মহানগরীতে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। এ সমস্যা সমাধানে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রাহকদের কাছে এর জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

এ পরিস্থিতি কবে ঠিক হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। তিতাসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যদিও জানা গেছে, পাইপলাইনে পানি বের করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দুই-তিনদিন সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি অন্যান্য উচ্চচাপের পাইপলাইনও পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেগুলোয়ও পানি ছড়িয়ে পড়লে আরো সময় লাগতে পারে। এতে কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহ সাময়িক বাধাগ্রস্ত হবে।

জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তুরাগ নদের তলদেশে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেটি মেরামত করা হয়েছে। তবে লিকেজ মেরামত করতে গিয়ে পাইপলাইনে পানি প্রবেশ করেছে। মোহাম্মদপুর এলাকার বড় একটি অংশে তা ঢুকে পড়েছে। ওই এলাকায় তিতাসের কর্মীরা পাইপলাইন থেকে পানি বের করে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করছেন। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো দুইদিন সময় লেগে যেতে পারে। পানির কারণেই গ্যাসের প্রেসারজনিত কিছু সমস্যা হচ্ছে।’

রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকাতেই স্বাভাবিক গ্যাস পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। এ বিষয়ে তিতাসের এমডি বলেন, ‘আমাদের আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা, তার চেয়ে ২০০-২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কম পাওয়া যায়। আবার শীতের কারণেও গ্রাহকরা বর্তমানে চাপ কম পাচ্ছে।’

তিতাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিতরণকারী কোম্পানিটির আওতাধীন আবাসিক গ্রাহক, শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে হলে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। সেখানে তিতাস গ্যাস পাচ্ছে কেবল ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশে গ্যাসের সরবরাহ সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদনেও। কয়েক মাস আগেও দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। অথচ গত বৃহস্পতিবার সরবরাহ নেমেছে ২ হাজার ৫৭৮ মিলিয়ন ঘনফুটে।

পেট্রোবাংলার শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসের স্থানীয় সরবরাহ কমছে। এলএনজিতে কিন্তু কোনো সংকট নেই। যে কারণে ঢাকায় বেশি সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া শীত মৌসুমে গ্যাসের প্রেসার কমে যায়। এতেও গ্যাস পেতে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে গ্রাহকের। তাই শীত মৌসুম না গেলে পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার সুযোগ কম।’

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র অবশ্য জানিয়েছে, পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের বড় একটি অংশই চুরি হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া লিকেজ, দুর্ঘটনা, রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে কোথাও না কোথাও পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশই বহু বছর আগের স্থাপিত অবকাঠামো বা সঞ্চালন লাইনের ওপর নির্ভরশীল। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের অভাবে মাঝেমধ্যেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি বিকল্প সঞ্চালন লাইনের ব্যবস্থা না থাকায় একটি লাইনে সমস্যা হলেই পুরো শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

তুরাগ নদের তলদেশে পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাজধানীর একটি বড় অংশের আবাসিক ভবনের পাশাপাশি হোটেল-রেস্তোরাঁ, ছোট কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করেই গ্যাসবিহীন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও চুলায় গ্যাস থাকলেও চাপ এতটাই কম যে রান্না করতে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। অনেক এলাকায় একেবারেই গ্যাস নেই।

রেস্তোরাঁ ও হোটেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, এলপিজির ওপর নির্ভর করে তাদের রান্না চালাতে হচ্ছে। কিন্তু এলপিজির দাম আগে থেকেই বেশি হওয়ায় লাভ তো হচ্ছেই না, বরং অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

আরও