পদ্মা-গড়াইয়ের তীরবর্তী কুষ্টিয়া বহুদিন ধরেই গান, সাধনা, সাহিত্য আর প্রতিবাদের জীবন্ত জনপদ। ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় লালন খুঁজেছেন মানুষ ও জীবনের গভীর অর্থ, শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ শুনেছেন বাংলার গ্রামজীবনের সুর। কুমারখালীতে কাঙাল হরিনাথ কলম ধরেছেন কৃষক-প্রজার পক্ষে, মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন নিজস্ব এক জগৎ, আর গগন হরকরার লোকসুর পেরিয়ে গেছে গ্রামের সীমানা। তাদের কেউ সাধক, কেউ কবি-সাহিত্যিক, কেউ সাংবাদিক, কেউ লোককবি। চিন্তা, সাহিত্য, সংগীত ও জীবনচর্চার ভিন্ন ভিন্ন ধারার এসব মানুষ মিলেই কয়েক প্রজন্ম ধরে কুষ্টিয়ার একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি করেছেন। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাউল-ফকিরি সাধনা, লোকসংগীত, সাহিত্য, নাটক, আবৃত্তি ও দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস। এ উত্তরাধিকারের কারণেই কুষ্টিয়া বহুদিন ধরে পরিচিত হয়ে এসেছে দেশের সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে কুষ্টিয়ায় জনপ্রিয় ও আলোচিত মুখের ধরনও বদলাচ্ছে। একসময় এ জেলার পরিচয় গড়ে উঠেছিল মূলত সাধক, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ঘিরে। লালন, রবীন্দ্রনাথ, মীর মশাররফ, কাঙাল হরিনাথ কিংবা পরে লালনসংগীতের শিল্পীরাই কুষ্টিয়াকে জাতীয়ভাবে পরিচিত করে তুলেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় বক্তা ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও বড় অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও ধর্মীয় বক্তা মুফতি আমির হামজা। বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক ও সমালোচনা। একই সময়ে জেলায় বাউলদের অনুষ্ঠান ও দরবারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনাও সামনে এসেছে। এ পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো কুষ্টিয়ার একসময়কার প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আবহও আগের মতো নেই। যে চর্চা একসময় সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ ছিল, তা এখন ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে পড়ছে।
কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সবচেয়ে বড় প্রতীক ফকির লালন শাহ। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তার আখড়াকে কেন্দ্র করে যে সাধকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, তাদের গান শুধু আধ্যাত্মিক সাধনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। জাতপাত, নারী-পুরুষের পরিচয় কিংবা মানুষের সামাজিক অবস্থান—এসব প্রচলিত বিভেদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন লালন। তার গানের কেন্দ্রে বারবার এসেছে মানুষের পরিচয় ও আত্মানুসন্ধান। ফলে লালনের প্রভাব শুধু সংগীতের একটি স্বতন্ত্র ধারাই গড়ে তোলেনি; মানুষ, জীবন ও সমাজকে দেখার একটি পৃথক দর্শনেরও জন্ম দিয়েছে। আজও ছেঁউড়িয়ায় তার স্মরণোৎসবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের বাইরে থেকে অনুসারী ও সংগীতপ্রেমীরা জড়ো হন।
লালনের কুষ্টিয়ার পাশেই শিলাইদহে আরেক সাংস্কৃতিক জগৎ গড়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে। জমিদারি দেখাশোনার কাজে এসে তিনি পদ্মাপাড়ের গ্রাম, কৃষক ও সাধারণ মানুষের জীবনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। শিলাইদহে অবস্থানকালে তার বহু কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও গান রচিত হয়। ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালি’সহ গুরুত্বপূর্ণ রচনার সঙ্গে এ সময়ের যোগ রয়েছে। এখানেই তিনি গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের কাজও শুরু করেছিলেন। ফলে শিলাইদহ শুধু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবাহী স্থান নয়, বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিশীল ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। কুষ্টিয়ার লোকজ সংস্কৃতি রবীন্দ্রনাথকেও প্রভাবিত করেছিল। শিলাইদহের ডাকপিয়ন গগন হরকরা গান গাইতেন। তার ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ গান রবীন্দ্রনাথের মনোযোগ আকর্ষণ করে। পরে রবীন্দ্রনাথ গানটি প্রকাশও করেন।
আরেকদিকে কুমারখালীতে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার সংস্কৃতিচর্চাকে যুক্ত করেছিলেন মানুষের অধিকার ও সাংবাদিকতার সঙ্গে। ১৮৬৩ সালে তিনি প্রকাশ শুরু করেন ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’। জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার, কৃষক-প্রজার দুর্দশা এবং গ্রামের সামাজিক সমস্যা—তার পত্রিকার বিষয় হয়ে ওঠে। কলকাতাকেন্দ্রিক সংবাদ ও সাহিত্যচর্চার বাইরে দাঁড়িয়ে মফস্বল থেকে সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরার এ উদ্যোগ কুষ্টিয়াকে বাংলার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেয়। পরে কুমারখালীতেই পত্রিকাটির নিজস্ব ছাপাখানা গড়ে ওঠে। লালনের গানও এ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।
কুমারখালীর লাহিনীপাড়ায় জন্ম মীর মশাররফ হোসেনের। তার ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যের বহুলপঠিত ধ্রুপদি রচনাগুলোর একটি। উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধসহ বিভিন্ন ধারায় তার কাজ উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমান সমাজের জীবন, ধর্মীয় ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতাকে সাহিত্যের মূলধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন সময়ে লিখেছেন, যখন বাংলা উপন্যাসের ধারাটিই গড়ে উঠছিল।
কবি, আবৃত্তিশিল্পী ও সংস্কৃতি সংগঠক আলম আরা জুঁই বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুষ্টিয়ার পরিচয় কেবল বাউল-ফকিরি সাধনা বা লোকসংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। অসাম্প্রদায়িক সামাজিক চেতনা, সাহিত্য, সংগীত ও মানবিক সংস্কৃতির দীর্ঘ চর্চাও এ অঞ্চলের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লালন ও কুষ্টিয়ার সংস্কৃতি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং স্থানীয় মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক চর্চাকেও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।’
কুষ্টিয়ার ছোট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে কয়েকটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ধারা। পরে লালনসংগীতের শিল্পী ফরিদা পারভীন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বারসহ আরো অনেকে সেই পরিচয়কে জাতীয় পরিসরে বহন করেছেন। ফলে কুষ্টিয়াকে ‘সংস্কৃতির রাজধানী’ বলা শুধু প্রচলিত বিশেষণ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস। এ ঐতিহ্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল ভিন্ন ধারার পাশাপাশি অবস্থান। কিন্তু সেই কুষ্টিয়াতেই এখন বাউল ও দরবার ঘিরে টানাপড়েনও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
২০২২ সালের ৫ নভেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার লাউবাড়িয়া গ্রামে একটি বাউল সাধুসঙ্গে হামলা হয়। লালনভক্ত পালান মণ্ডলের বাড়িতে আয়োজিত দুইদিনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন এলাকা থেকে বাউল, সাধু ও লালন অনুসারীরা যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে হামলায় অন্তত আটজন আহত হন।
একই উপজেলার ফিলিপনগরে চলতি বছরের ১১ এপ্রিল কথিত পীর আবদুর রহমান শামীম ওরফে শামীম আল-জাহাঙ্গীরের দরবারে কয়েকশ মানুষের একটি দল হামলা চালায়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে তার দরবার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা পরে জানান, পুরনো কিছু ভিডিও নির্দিষ্ট এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির ঘটনা তারা তদন্ত করছেন। ঘটনার অভিঘাত শুধু ওই দরবারেই থামেনি। আরো অস্থিরতার আশঙ্কায় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে বাউলশিল্পী শফি মণ্ডলের বাড়িতেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
ফিলিপনগরে মাজারে হত্যাকাণ্ডের মামলায় দুই আসামির জামিনও নামঞ্জুর করেছেন আদালত। গত ৩০ জুন কুষ্টিয়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন মামলার প্রধান আসামি খাজা আহমেদ ও আসাদুজ্জামান। শুনানি শেষে আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে তারা হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে ছিলেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরো ১৮০-২০০ জনকে আসামি করা হয়। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলায় জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে। মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের ৯ মে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর বড় বাজারসংলগ্ন দরগাতলা গ্রামে হজরত শাহ রউফের মাজারের খাদেম কামাল হোসেনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনাগুলো কুষ্টিয়ার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান সময়ের একটি বৈপরীত্য সামনে এনেছে। যে জেলায় লালনের আখড়াকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের সাধক ও অনুসারীরা মিলিত হন, যে জেলায় লোকসংগীত ও বাউল দর্শন দীর্ঘদিন সামাজিক পরিচয়ের অংশ সেখানেই এসব ঘটনা সাংস্কৃতিক সহনশীলতার গতিপথ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির নেতা ও বাউল সংগঠক আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু বলেন, ‘কুষ্টিয়ার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বর্তমানে সাম্প্রদায়িকতার যে প্রবণতা এখন দেখা যায়, তা এ জনপদের ঐতিহাসিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বাউল-ফকিরি সাধনা, লোকসংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক সামাজিক চেতনার বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন, বিভাজন এবং স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রভাবে সেই ঐতিহ্যের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর বিরুদ্ধে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।’
সাংস্কৃতিক পরিসরে এ টানাপড়েনের মধ্যেই কুষ্টিয়ার জনপরিসরে ধর্মীয় বক্তা হিসেবে আমির হামজার প্রভাব বেড়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে আসার আগে থেকেই বর্তমানে কুষ্টিয়া-৩ আসনের এ সংসদ সদস্যের বিভিন্ন বক্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তার একটি বক্তব্য বড় বিতর্ক তৈরি করে। তিনি দাবি করেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের সকালে ‘মদ দিয়ে কুলি’ করতে দেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও তার আরেকটি বক্তব্য বিতর্কের জন্ম দেয়। এক ওয়াজে তিনি দাবি করেন, ১৬ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে আজান দিতে দেয়া হয়নি। পরে তিনি দাবি করেন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের কথা বলতে গিয়ে ভুল করে মুহসীন হলের নাম বলেছেন এবং এজন্য ক্ষমা চান। এরও আগে ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার সৌন্দর্য নিয়ে একটি ওয়াজে তার মন্তব্য সমালোচিত হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান তিনি।
সংসদ সদস্য হওয়ার পরও তার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক থামেনি। ২০২৬ সালের মার্চে কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর বড় মসজিদে জুমার খুতবার আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে তিনি ‘আপাদমস্তক নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী’ বলে আখ্যায়িত করেন। আরেক ওয়াজে জাতীয় সংসদের নারী সদস্য রুমিন ফারহানা, ফারজানা শারমিন ও নায়াব ইউসুফকে নিয়ে তার মন্তব্যও সমালোচিত হয়। এর বাইরেও বিভিন্ন সময়ে তার একাধিক বক্তব্য সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি আমির হামজা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি আমার রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সবসময় কথা বলি। দলের আদর্শ, নীতি ও কর্মসূচির যে অবস্থান, আমার বক্তব্যেও তারই প্রতিফলন থাকে। ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার চেয়ে রাজনৈতিক দলের ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের আলোকে কথা বলাকেই আমি গুরুত্ব দিই।’
এছাড়া এক ওয়াজ মাহফিলে তিনি ‘লালন শাহের মাজার ভেঙে ফেলা দরকার ছিল’ বলে মন্তব্য করেন। নানা বিতর্কের মধ্যেই সম্প্রতি কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু লালন আখড়াও উঠে আসে সংসদে। গত জুনে আমির হামজা সংসদে জানতে চান, কুষ্টিয়ার লালন শাহের আখড়াবাড়ি এলাকাকে ‘মাদকমুক্ত’ করার কোনো সরকারি উদ্যোগ রয়েছে কিনা। জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘পুরো দেশকে মাদকমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েই সরকার কাজ করছে।’
এ বিষয়ে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা লালনের দর্শনকে প্রশ্নের মুখে ফেলছেন, তারা লালন সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও লালনের দর্শনকে কোনো প্রশাসনিক সমস্যার সঙ্গে এক করে দেখা হলে বিষয়টির প্রকৃত তাৎপর্য আড়ালে পড়ে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘লালনের দর্শনকে বুঝতে হলে তার গান, সাধনা ও মানবতাবাদী চিন্তার সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করতে হবে। কোনো একটি সামাজিক বা প্রশাসনিক সমস্যার সঙ্গে লালনের দর্শনের সম্পর্ক স্থাপন করলে লালনকে বোঝার ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়।’
কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখনো দৃশ্যমান থাকলেও নিয়মিত সংস্কৃতিচর্চার পরিসর আগের মতো প্রাণবন্ত নেই বলে মনে করেন সংস্কৃতিকর্মীরা। একসময় নাটক, আবৃত্তি, সংগীতচর্চা, সাহিত্য সভা, বাউল-ফকিরদের আসর ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রমে যে সামাজিক অংশগ্রহণ দেখা যেত, তা এখন অনেকটাই কমেছে।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার বিষয়টি বিচ্ছিন্ন নয়; পুরো দেশের সামগ্রিক পরিবর্তনের প্রভাব এখানেও পড়েছে বলে মনে করেন অভিনেতা ও নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলু। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা কমেছে। কুষ্টিয়াতেও তার প্রভাব পড়েছে। তার পরও লালনচর্চা এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গবেষণার বিষয়। এ ধারার সঙ্গে এখনো অনেকে যুক্ত আছেন এবং এটিকে নতুনভাবে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। তবে একসময় কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অনেক বেশি পারস্পরিক আদান-প্রদান ছিল। এখন সেটি অনেক কমে গেছে।’ তার মতে, আগের প্রজন্ম যে দৃঢ়তার সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখন তা কমেছে। আর্থসামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তন, মানুষের ব্যস্ততা এবং জীবন-জীবিকার চাপও এর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি।
সংস্কৃতিচর্চায় ভাটার পাশাপাশি জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত নয় মাসে জেলায় ৪৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, পূর্ব বিরোধ, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধসহ বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। সর্বশেষ দৌলতপুরে কথিত পীর আবদুর রহমান শামীম হত্যাকাণ্ড এবং খোকসায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জোড়া হত্যাকাণ্ড জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, পুলিশ প্রতি ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গত মাসে এ জেলায় যোগদান করেছেন জানিয়ে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
কোনো ঘটনাই কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।’ আগামী মাসে লালন মাজারে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এ আয়োজনে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষ এবং দেশের লাখো বাউল ও লালনপ্রেমীরও গভীর প্রত্যাশা রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।’