ভারতের আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। তবে এ বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ আদানি পাওয়ারের বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), যার পরিমাণ মোট ৪ হাজার ৭৬৮ কোটি ৪৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা (৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৭ ডলার)। আদানির বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকির এ অর্থ বিপিডিবিকে পরিশোধ করার জন্য চাপ দিচ্ছে এনবিআর। দফায় দফায় বিপিডিবিকে চিঠি দেয়ার পরও অর্থ আদায়ে কোনো অগ্রগতি দেখছে না সংস্থাটি।
আদানির শুল্ক ফাঁকির টাকা পরিশোধ চেয়ে গত ২৮ জুন বিপিডিবিকে চিঠি দেয় এনবিআরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ রহনপুর স্থল কাস্টমস স্টেশন। বিপিডিবির চেয়ারম্যান বরাবর এ চিঠিতে সহকারী কমিশনার সাব্বির আহমেদ জিসানের সই রয়েছে। আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসছে রহনপুরের মধ্য দিয়ে।
চিঠিতে বলা হয়, আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে বিপিডিবির আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর মোট ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৭ ডলার শুল্ক পাওনা রয়েছে। এ পাওনার বিষয়ে প্রথম দফায় বিপিডিবিকে কারণ দর্শানো নোটিস দেয়া হলেও কোনো জবাব দেয়নি সংস্থাটি। পরে ২৮ জুন পাওনা পরিশোধের বিষয়টি জানিয়ে আবারো চিঠি দেয় রহনপুর স্থল কাস্টমস স্টেশন। প্রথম দফায় কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হলে ১৫ কর্মদিবস সময় দেয় কাস্টমস। কিন্তু পরে দুই মাস সময় বাড়ানোর বিষয়ে অনুরোধ জানায় বিপিডিবি। কিন্তু দুই মাসের সঙ্গে আরো এক মাস সময় চেয়েছিল সংস্থাটি। বিপিডিবির অনুরোধে কাস্টমস মোট তিন মাস সময় বাড়ানোর পরও অর্থ পরিশোধের বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি বিপিডিবি। ২৮ জুন বিপিডিবি বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জবাব দেয়ার অনুরোধ করা হয় বিপিডিবিকে। কিন্তু এ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো উত্তর দেয়নি সংস্থাটি।
ভারতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি আদানি পাওয়ার (ঝাড়খণ্ড) লিমিটেড থেকে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করে বাংলাদেশ। কাস্টমস আইন অনুযায়ী এ আমদানিসেবার ওপর শুল্ক প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু এনবিআর কোনো শুল্ক পায়নি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানি শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি আইন অনুযায়ী বিপিডিবিকে পরিশোধ করতে হবে। কারণ তারাই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। আইনি কাঠামোয় আদানি পাওয়ারকে ধরার কোনো সুযোগ নেই এনবিআরের।’
আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হয় বিপিডিবির সঙ্গে। কিন্তু আইন অনুযায়ী শুল্কের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব এনবিআরের। বিদ্যুৎ আমদানি শুরুর পর থেকে শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি নিয়ে এনবিআর কেন ব্যবস্থা নেয়নি এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তরের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা শুল্কের বিষয়টি নিয়ে বিপিডিবিকে দফায় দফায় চিঠি দিয়েছি, শুরুতে তারা জবাব দেয়নি। শুরুতে শুল্কের বিষয়টি এনবিআর অবগত ছিল না।’
দেশে বিদ্যুৎ রফতানি করছে আদানি পাওয়ার। আইন অনুযায়ী, আমদানি শুল্ক কখনো রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় না। সেক্ষেত্রে আদানির শুল্ক ফাঁকির অর্থ আদায়ের বিষয়টি আইন অনুযায়ী বিপিডিবির ওপর পড়ে। ফলে আদানির কাছ থেকে অর্থ আদায় এনবিআরের ওপর পড়ে না বলে জানান সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
এনবিআরের টাকা পরিশোধের বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আদানি শুল্ক ফাঁকির টাকা এনবিআরকে পরিশোধ করতে হলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে বিপিডিবিকে। সেটা যদি করে তাহলে আমরা এনবিআরের টাকা পরিশোধ করতে পারব। এ বাইরে আইন অনুযায়ী এ অর্থ কোনোভাবেই আদানির ওপর বর্তায় না। এককভাবে বিপুল পরিমাণ এ অর্থ পরিশোধ করার সামর্থ্য নেই বিপিডিবির। সরকারের কাছ থেকে অর্থ পেলেই কেবল এনবিআরের টাকা পরিশোধ করা যাবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আবার এনবিআরকে চিঠি দেব।’
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আদানি পাওয়ারসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দাবি ওঠে। এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্রয় চুক্তি খতিয়ে দেখতে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। কমিটি আদানি পাওয়ারসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি খতিয়ে দেখে। এ পরিস্থিতির মধ্যে আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে প্রায় ৪০ কোটি ডলারের শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পায় এনবিআর। বহুল আলোচিত বিদ্যুৎ কেনার এ চুক্তির সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে শুল্ক ও কর অব্যাহতি দেয়ার তথ্যও উঠে আসে সংস্থাটির তদন্তে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ প্রবেশ ও সঞ্চালনের সময় আমদানির যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের অংশ হিসেবে কোনো বিল অব এন্ট্রি যেমন দাখিল করা হয়নি, তেমনি তা আইনি পন্থায় নিষ্পত্তি না করার প্রমাণও পাওয়া যায়।
২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করে। ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় অবস্থিত। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। এ কেন্দ্র থেকে ২৫ বছর ধরে বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া রেখে যায়, যা অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এ বকেয়ার বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী পুরোটাই পরিশোধ করা হয়েছে।