এর আওতায় মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা ও খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা, বাংলা ও ইংরেজির বাইরে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় ইনোভেশন গ্র্যান্ট চালু। মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এজেন্ডাগুলো তুলে ধরেন। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমাদের সরকার শিক্ষাকে আর খরচের খাত হিসেবে দেখবে না। শিক্ষা হবে রাষ্ট্রের প্রথম বিনিয়োগ, মানবসম্পদের মূল কারখানা এবং জাতি গঠনের প্রধান প্রকল্প।’
১২টি পয়েন্টে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিগত এজেন্ডা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম শর্ত হলো অর্থায়ন। গত বছরগুলোয় এ খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশের আশপাশে থেকেছে এবং জিডিপির অনুপাতে তা দেড়-দুই শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করেছে, এটা একটি কাঠামোগত সীমা। কিন্তু আমাদের সরকারের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার—শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। এটা আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারও। আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও বলে, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪-৬ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫-২০ শতাংশ—এ লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হবে। আর এগুলো অর্জনে আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মাঝারি মেয়াদের বাজেট কাঠামো অনুযায়ী ধাপে ধাপে তিন বছরের ফিসক্যাল আপলিফট পরিকল্পনা দেব। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও শুধু মোট টাকার পরিমাণ নয়, কোথায় টাকা যাবে সেটাও বদলাতে হবে। তাই বাজেটের সমতা ও শেখার ফলাফল দুটি প্রধান সূচক হবে।’
শেষ ত্রৈমাসিকের হুড়োহুড়ি বন্ধ করে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, খরচের মান বদলাতে হবে। কারণ উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ বছরের শেষে হঠাৎ ব্যয় হওয়ায় বই বিতরণ, নির্মাণকাজ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্কুল ক্যালেন্ডার মিস করে। গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে ফেরত গেছে বলেও জানানো হয়।
এটি শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, শিক্ষার্থীর সময় ও সুযোগের ক্ষতি বলে উল্লেখ করেন ববি হাজ্জাজ। এ অবস্থার পরিবর্তনে পরিকল্পনা কমিশনের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অনুমোদন ও প্রকল্প গেটকিপিং স্কুল বর্ষপঞ্জির সঙ্গে পুনঃসমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি।
উন্নয়ন ব্যয়কে আবার অগ্রাধিকার দিতে হবে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চলতি ব্যয় স্কুলকে খোলা রাখে, কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় স্কুলকে আধুনিক করে। তাই অগ্রাধিকার হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা; বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, ভাষা ল্যাব তৈরি করা; ডিজিটাল কনটেন্ট ও মূল্যায়ন সক্ষমতা তৈরি করা; স্কুলের অবকাঠামো বিশেষ করে পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক করা। এছাড়া নির্বাচনী অঙ্গীকার মিড-ডে মিল, পরিষ্কার টয়লেট ও ছাত্রীদের জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা বাস্তবায়ন করার কথাও বলা হয়েছে।
এদিকে বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারে শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়ে বলা হয়, ফ্রি ওয়াই-ফাই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব ব্যবস্থা চালু। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুলপর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সচেতনতা, সাইবার সেফটি—তিনটি বিষয়কে বাধ্যতামূলক করা হবে। এছাড়া শিক্ষকদের ট্যাবে থাকবে পাঠ পরিকল্পনা টেমপ্লেট, প্রশ্ন ব্যাংক, উপস্থিতি ও শিখন-প্রমাণ (লার্নিং এভিডেন্স)।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে তৃতীয় ভাষা যেমন আরবি, চীনা, জাপানি, ফরাসি যেগুলোর শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষায় চাহিদা আছে এমন ভাষাশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শিক্ষক, কনটেন্ট ও মূল্যায়নের প্রস্তুতির জন্য এটির বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। ভাষাশিক্ষা শুধু পড়ালেখা নয়, শোনা ও বলাও যুক্ত করা হবে। মূল্যায়নে ধাপে ধাপে কমিউনিকেশন স্কিল অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই বিজ্ঞানশিক্ষা, প্রযুক্তি সাক্ষরতা ও প্রজেক্টভিত্তিক কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিটি উপজেলায় নির্বাচিত স্কুলে রোবটিকস ও মেকার কর্নার তৈরি ও বিজ্ঞানকে বই থেকে বের করে টার্মভিত্তিক প্র্যাকটিক্যাল রুটিনে আনা হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে বাধ্যতামূলক করা হবে বিষয়জ্ঞান ও অ্যাসেসমেন্ট লিটারেসি।
মাধ্যমিক স্তরে ক্রীড়া শুধু ইভেন্ট হিসেবে নয়, টাইমটেবিলভিত্তিক বাধ্যতামূলক হবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ে স্কুল ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত স্পোর্টস পিরিয়ড থাকবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চালু করা হবে ট্যালেন্ট হান্ট ও স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপ বা লিগ।
পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হবে ওয়ার্কড এক্সাম্পল, প্র্যাকটিস সেট ও রিভিশন ক্যালেন্ডার। বোর্ড পরীক্ষায় ধাপে ধাপে চালু করা হবে আইটেম ব্যাংক, ব্লুপ্রিন্ট, মডারেশন ও স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন গাইডলাইন। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে ন্যূনতম শিখন মানদণ্ড (মিনিমাম লার্নিং স্ট্যান্ডার্ড) নির্ধারণ করবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি বেতন-সুবিধা ও স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত হবে শিক্ষাদানের বাস্তব প্রমাণ (কন্ট্যাক্ট আওয়ার, ক্লাস অবজারভেশন, লার্নিং এভিডেন্স)। কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং কারি ও আলেমদের রাষ্ট্র স্বীকৃতির কথাও বলা হয়েছে শিক্ষা পরিকল্পনায়।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে তৈরি হবে ক্রেডিট ব্রিজ কোর্স। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া ইন্টার্নশিপ ও ক্যারিয়ার সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বাধ্যতামূলক করা হবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে।
সরকারের এ উদ্যোগকে একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এটি খুবই ভালো একটি কাঠামো। তারা যে কাজ শুরু করবে তার একটি আভাস পেলাম। যেসব সংস্কারের বিষয় শনাক্ত করা হয়েছে এগুলো প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয় কতদূর এগোতে পারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে সুপারিশগুলো এসেছে সেগুলো যেন আমলে নেয়া হয়। আমার প্রত্যাশা, এ পরিকল্পনা শুধু যেন সচিবালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। যা-ই করা হোক তা যেন বৃহৎ পরিসরে শিক্ষার অংশীজন—শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপ করে বাস্তবায়ন করা হয়।’ দেশে প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা উচিত বলেও মনে করেন এ শিক্ষাবিদ।
এদিকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ইনোভেশন গ্র্যান্ট প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস নেবে না, গবেষণা ও উদ্ভাবন করবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ইনোভেশন গ্র্যান্ট চালু করা হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে স্টুডেন্ট লোন ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা সহায়তার ব্যবস্থা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।
জবাবদিহিতা প্রসঙ্গে বলা হয়, প্রকল্পের টাকা খরচ হলো, কিন্তু ক্লাস হলো না—এ ধরনের সংস্কৃতি ভেঙে ফেলা হবে। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক পাবলিক ড্যাশবোর্ড থাকবে, যেখানে প্রকল্প অগ্রগতি, প্রশিক্ষণ সংখ্যা, বই বিতরণ, ক্লাসের সব তথ্য উন্মুক্ত থাকবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে প্রকাশ হবে শিক্ষা রিপোর্ট কার্ড। অভিযোগ ও সেবার মান পর্যবেক্ষণে ট্র্যাকিং নম্বরভিত্তিক ফিডব্যাক ব্যবস্থা থাকবে।
এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে টাইমলাইন তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমরা তিন ধাপের টাইমলাইন ধরে এগোব। প্রথম ধাপ—ডায়াগনস্টিক রিভিউ, উন্নয়ন বাজেট ফেরত যাওয়ার কারণভিত্তিক রুট-কজ অ্যানালাইসিস, শিক্ষক ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ও ভাষাশিক্ষা পাইলট ডিজাইন। দ্বিতীয় ধাপ—প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ ঘোষণা। তৃতীয় ধাপ হবে ১২ থেকে ৩৬ মাসের; অর্থাৎ এক বছর থেকে তিন বছর।’
সর্বশেষ ধাপের কাজের বর্ণনা তুলে ধরে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তৃতীয় ধাপে আমরা পরীক্ষা ও মূল্যায়নে বড় ধরনের টেকনিক্যাল রিফর্ম করব। কারিগরি, সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষায় ব্রিজিং করা হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট স্কেল আপ করা হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের তিনটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এগুলো হলো শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষে ফেরানোর পরিবেশ সৃষ্টি, জাতীয় কারিকুলাম পর্যালোচনা ও পরিমার্জন এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন। শিক্ষামন্ত্রী জানান, ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষকের জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হবে। ১৮০ দিনের রোডম্যাপ শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘অতীতে বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা বন্ধ বা অটোপাসের মতো কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সেগুলো কখনই স্থায়ী বা কাঙ্ক্ষিত সমাধান ছিল না। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী, মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক করা। আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণে যেন কোনো অনিয়ম না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কারিকুলাম বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’