মিঠাপানির অভাবে বছরের অধিকাংশ সময় পড়ে থাকত ফসলি জমি। লোনাপানি আটকে চিংড়ি চাষের কারণে একসময় শুধু বর্ষা মৌসুমেই আমন ধান উৎপাদন হতো। এখন সেই জমিগুলোই স্বপ্ন দেখাচ্ছে উপকূলের চাষীদের। পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি এলাকার এক কৃষক লবণাক্ত জমিতে বার্লি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন।
কৃষি বিভাগ বলছে, শস্যটি উচ্চ পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। এটির আটা দিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন রুটি, শিশুখাদ্য, স্যুপ তৈরি করা হয়। এমনকি রোগীর পথ্য হিসেবেও বার্লির ব্যবহার রয়েছে। বাজারে এর চাহিদা এবং দামও ভালো।
বার্লি চাষী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবন লবণাক্ত এলাকা। জমিতে রবি ফসল হিসেবে আগে গম ও বোরো ধান চাষ করতাম। এবার কৃষি গবেষণা বিভাগের পরামর্শে প্রথমবার এক বিঘা জমিতে বার্লি চাষ করেছি। কৃষি বিভাগ বিনামূল্যে বীজ, সার সবকিছু দিয়েছে। বার্লির সঙ্গে এখানকার কৃষক পরিচিত নন। চাষ সম্পর্কেও তেমন ধারণা না থাকায় শুরুতে ফলন হয় কিনা সেটা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু এখন ফলন দেখে ভালো লাগছে। আশপাশের কৃষকও দেখতে আসছেন আমার খেত। অনেকে বার্লির বীজও রাখতে বলছেন।’
বার্লিকে উপকূলীয় কৃষির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। পাইকগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একরামুল হোসেন বলেন, ‘বার্লি চাষ এ এলাকায় এটাই প্রথম। এটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট তদারকি করছে। উপকূলীয় কৃষিতে বার্লি সংযোজন হলে সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।’
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সরজমিনে গবেষণা বিভাগে কাজ করছেন জাহিদ হাসান। পাইকগাছা উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এ বৈজ্ঞানিক সহকারী বলেন, ‘এ এলাকায় এটিই প্রথম পরীক্ষামূলক বার্লি আবাদ। রবি মৌসুমে লবণাক্ততার কারণে যেখানে অন্য ফসল ঝুঁকিতে থাকে, সেখানে বার্লি হতে পারে সম্ভাবনাময় বিকল্প। বারি বার্লি-৭ ও বারি বার্লি-১০ দুটি জাতই লবণসহিষ্ণু এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী। বারি বার্লি-৭ খাটো এবং ৯০-১০৫ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। আর বারি বার্লি-১০-এর উচ্চতা ৯০-৯৫ সেন্টিমিটার। এটি লবণাক্ত জমিতেও হেক্টরপ্রতি গড়ে ২ থেকে ২ দশমিক ৪ টন ফলন দেয় এবং ৮০-৮৬ দিনের মধ্যে পাকতে শুরু করে। পাইকগাছার জন্য বারি বার্লি-১০ তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী।’
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করতে কৃষকদের প্রচলিত চাষাবাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বিকল্প তৈরি করা জরুরি। দেশে বার্লির চাহিদা থাকলেও উৎপাদন কম হওয়ায় আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বার্লিভিত্তিক শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এ ফসল খাদ্য ও পশুখাদ্য উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’