ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডের ৩৪ নম্বর শয্যা। ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে সেখানে ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন ফারহানা নিশা। দুদিন ধরে ড্রেসিং না হওয়ায় রক্ত শুকিয়ে আছে মুখে। বিছানার এক কোনায় তার হাত ধরে বসে আছেন স্বামী নজরুল (ছদ্মনাম)। তার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। কথা বলে জানা যায়, ঈদের পরদিন ভোলার বাপ্তা ইউনিয়ন এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হন নিশা। স্থানীয় হাসপাতালে নিলেও পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় তাকে। তবে এখানে এসেও অবস্থার খুব একটি উন্নতি হয়নি। সময়মতো চিকিৎসা দিতে আসছেন না কেউ। নার্সদের ব্যবহারও সন্তোষজনক নয়। এমনকি হাসপাতালের শয্যা পেয়েছেন এক কর্মচারীকে ৫০০ টাকা দিয়ে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বিভিন্ন খাতের সংস্কার। স্বাস্থ্যসেবাকে জনমুখী, সহজলভ্য ও সর্বজনীন করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাবের লক্ষ্যে ‘স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন’ নামে কমিশন গঠন করে গত ১৮ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয়। এ কমিশন গত ৫ মে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। ক্ষমতায় যাওয়ার ১০ মাস পার হলেও এ খাতে দৃশ্যমান কোনো সংস্কারই চোখে পড়ছে না, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর ভেতরকার দুর্ভোগ।
দেশের প্রধান চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসে। কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, এ হাসপাতালে গতকাল ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৬৯। মোট শয্যা সংখ্যার (২ হাজার ৬০০) তুলনায় মাত্র ১৬৯ জন বেশি ভর্তি। তবে হাসপাতালের ভেতরকার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সরজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালটির পুরনো ভবনের দ্বিতীয় তলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওয়ার্ডে যাওয়ার পথে সারিবদ্ধ বিছানা পাতা। কোনো বিছানায় দুজন, কোনো বিছানায় তিনজন করে মানুষ; যার কারণে চলাচলের জায়গা অনেক সংকীর্ণ হয়ে গেছে। স্ট্রেচার বা হুইল চেয়ারে করে রোগী আনা-নেয়া করতে সমস্যা হচ্ছিল কর্মচারীদের। রোগীদের কারো হাতে স্যালাইন লাগানো, কারো মাথায় ব্যান্ডেজ করা। ওয়ার্ডের ভেতরেও দেখা যায় একই ধরনের চিত্র। প্রতিটি শয্যার নিচে আরেকটি করে বিছানা পাতা। কোনো কোনো রোগীর সঙ্গে দুজন স্বজনও রয়েছে। একটি মাত্র বিছানায় গাদাগাদি করে থাকছে তারা। শুধু ওয়ার্ডই নয়, হাসপাতালের টয়লেটগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। দুর্গন্ধে ভেতরে ঢোকা দায়। মেঝেতে জমে আছে নোংরা পানি। কোথাও পানির কল ঠিকভাবে কাজ করছে না।
অতিরিক্ত রোগীর চাপে সৃষ্ট সমস্যার কথা স্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা জানান, এখানে চিকিৎসা নেয়া বেশির ভাগ মানুষই অল্প শিক্ষিত, যার কারণে অনেক নিয়ম-কানুনই তারা মানে না। আশপাশের পরিবেশ নোংরা থাকে। হাসপাতালটির সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু কিছু জায়গায় পরিবর্তন হয়েছে। আগে মানুষ প্রতিবাদ করত না। এখন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রতিবাদ করে। তবে সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আমরা আশাবাদী যে ধীরে ধীরে সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন হবে।’
গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফটকে হুইসেল বাজাচ্ছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে শুয়ে আছে মরণাপন্ন রোগী। কিন্তু সামনে ফেরিওয়ালা ও পার্কিংয়ে থাকা রিকশার কারণে অ্যাম্বুলেন্স এগোতে পারছে না। একটু ভেতরে গিয়ে দেখা গেল ফটকের সামনে অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অর্ধশতাধিক যান প্রবেশপথ বন্ধ করে আছে। যেন গ্যারেজে পরিণত হয়েছে হাসপাতাল। একজন রিকশাচালক বলেন, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রায় এমন চিত্রই দেখা যায় এখানে। ১ মিনিটে একজন রোগীর বাঁচা-মরা নির্ভর করলেও এ জটে আটকে থাকতে হয় অনেকটা সময়। ভিড় ঠেলে টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে দেখা গেল লম্বা সারি। জরুরি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে ও বাইরে রোগী ও চিকিৎসকের চেয়ে দর্শনার্থী বেশি। চিকিৎসক-নার্সদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘গুরুতর একজন রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার চেয়ে ভিড় সামলাতে বেশি সময় দিতে হয়। শৃঙ্খলা বিধানে স্বাস্থ্য পুলিশের ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি।’
হাসপাতালের রান্নাঘরে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে রান্না করা হচ্ছে, তার আশপাশে বর্জ্য জমে রয়েছে। খাদ্যদ্রব্যগুলো ঢেকে রাখা হয়নি। এগুলো রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
করিডোর দিয়ে নতুন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে সেখানে দেখা যায়, সিঁড়ির দুই পাশে পানের পিক ও থুথুর আস্তরণ পড়েছে। কমপ্লেক্সের সামনে ফেরিওয়ালা ও বহিরাগতদের জন্য হাঁটা মুশকিল। পা ফেলার জায়গা নেই। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে-বসে পান-সিগারেট সহকারে খোশগল্পে মেতেছে একদল লোক। সেখানে পার্কিংয়ের জন্য অ্যাম্বুলেন্স থেকে চাঁদা নিচ্ছিলেন মাঝ বয়সী এক ব্যক্তি। চাঁদার বিনিময়ে পার্কিংয়ের সুযোগ পাওয়া যায় বলে অভিযোগ নতুন নয়। এ সিন্ডিকেটের হাত অনেক বড় হওয়ায় অনেক চেষ্টা করেও তাদের তাড়াতে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন খোদ হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মোট শয্যা সংখ্যা ২ হাজার ৬০০। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালে হাসপাতালটির বেড অকুপেন্সি রেট (বিওডি) ছিল ১৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় দেড় গুণ রোগী ভর্তি থাকত হাসপাতালটিতে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে মোট ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬০০। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫১৬ জন রোগী ভর্তি হয়। আর চলতি বছরের মে পর্যন্ত মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৭ হাজার ৭০৭। দৈনিক গড়ে ৫০৪ জন করে রোগী ভর্তি হচ্ছে। ২০২৪ সালে হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮৩২ ও বহির্বিভাগে ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৭৮ জন সেবা নেয়। আর চলতি বছরের মে পর্যন্ত জরুরি বিভাগে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৯ ও বহির্বিভাগে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৩৬৪ জন চিকিৎসা নেয়। প্রতিদিন এত রোগীর চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই হাসপাতালটিতে। এমনকি ভেতরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য পুলিশ বলতে কিছু নেই। বাইরে আমাদের যে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োজিত রয়েছে তা এখানে যে পরিমাণ রোগী থাকে সে তুলনায় অনেক কম, যার কারণে হাসপাতালের ভেতরে বেশ বিশৃঙ্খলা থাকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতালের যারা সেবাকাজে নিয়োজিত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সেবার মান বাড়াতে হলে রোগীর চাপ কমাতে হবে। লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে হবে। হাসপাতালের নানা যন্ত্রপাতি বিভিন্ন সময় নষ্ট থাকে। এগুলো দেখাশোনা করার জন্য আলাদা জনবল প্রয়োজন। এখানে যে পরিমাণ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে সে তুলনায় যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। তবে কিছু জিনিসের পরিবর্তন হয়েছে। আগে কেবল একটি কোম্পানি এখানে ওষুধ সরবরাহ করত। কিন্তু এখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও সুযোগ দেয়া হয়েছে।’
চিকিৎসক সংকট তেমন না থাকলেও হাসপাতালটিতে নার্স এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সংকট রয়েছে বলে জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকের সংকট নেই। কেননা আমাদের এখানে অনেক ট্রেইনি ও ইন্টার্ন ডাক্তার থাকেন। হাসপাতালে ৬৫০ চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর বাইরে কলেজের প্রিন্সিপালের অধীনে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপকসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক রয়েছেন, যারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবা দেন। তবে বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষকরা চিকিৎসা দেন না। সিনিয়র ও জুনিয়র কনসালট্যান্টরা আমাদের আওতাধীন। তারা হাসপাতালে সেবা দেন। নার্সের সংখ্যা ২ হাজার ৬০০। তবে তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানা কারণে অনুপস্থিত আছেন।’
তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমাদের এখানে ৬৫০ জনের অধিক চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী রয়েছেন। এছাড়া দৈনিক ভিত্তিতে ৫০০ জনের মতো কর্মচারী আছেন। সব মিলিয়ে ১ হাজার ১০০ জনের মতো কর্মচারীর মধ্যে ছুটি বাদ দিলে প্রতিদিন তিন শিফটে ৮০০-৯০০ কর্মচারী সেবা দিচ্ছেন। এ লোকবল যথেষ্ট নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘এত বড় একটি হাসপাতালে সমস্যা থাকতেই পারে। ভবনটি ১২০ বছরের পুরনো। এর ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। বিষয়টি সমাধানে আমরা কাজ করছি। চিকিৎসকদের রোগী দেখার কক্ষগুলো ছোট ছিল। আমরা সব বড় করে দিচ্ছি। এ রকম বেশকিছু কাজের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। এরই মধ্যে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে।’