দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪২ লাখ খর্বাকৃতি, ৩ লাখ শিশুর অতিরিক্ত ওজন

এক যুগে প্রাপ্তবয়স্কদের স্থূলতা বেড়েছে ১৭৫ শতাংশ

বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা বর্তমানে ৪২ লাখ। একই বয়সী অতিরিক্ত ওজনের শিশুর সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।

অন্যদিকে গত এক যুগে (২০১২-২০২৪) দেশে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব স্থূলতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ২৪ লাখ থেকে বেড়ে ৬৬ লাখে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এ সময়ে স্থূলতায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৭৫ শতাংশ। জাতিসংঘের প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ (এসওএফআই) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় বাংলাদেশে পুষ্টির প্রধান সমস্যা ছিল খাদ্যঘাটতি ও অপুষ্টি। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ, খাদ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার রূপান্তরের ফলে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা। ফলে একই পরিবারে একদিকে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত মানুষও দেখা যাচ্ছে। পুষ্টিবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে ‘ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’ বলা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা কমলেও তা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ২০১২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬২ লাখ, যা ২০২৪ সালে কমে ৪২ লাখে নেমেছে। বর্তমানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৫ দশমিক ১ শতাংশ খর্বাকৃতির। তবে একই সময়ে অতিরিক্ত ওজনের শিশুর সংখ্যা তিন লাখেই স্থির রয়েছে। পুষ্টিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না পাওয়া, গর্ভকালীন ও জন্ম-পরবর্তী অপুষ্টি, ঘন ঘন সংক্রমণ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাব এবং মাতৃপুষ্টির দুর্বলতা শিশুদের খর্বাকৃতির প্রধান কারণ। এর প্রভাবে শুধু শিশুর উচ্চতা নয়, মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার সক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এ সমস্যা ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে শিশুদের অতিরিক্ত ওজনের পেছনে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত কিন্তু কম পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবারের সহজলভ্যতা, অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ, শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বড় ভূমিকা রাখছে। শৈশবে অতিরিক্ত ওজন ভবিষ্যতে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর,বি) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপুষ্টির কারণে শিশুরা খর্বকায় হয় এবং অতিপুষ্টির কারণে তাদের অতিরিক্ত ওজন দেখা দেয়। অতিপুষ্টিও এক ধরনের অপুষ্টি। শিশু সঠিকভাবে পুষ্টি না পেলে তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। কাজেই সঠিক মাত্রায় সুষম খাদ্য দিয়ে শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে তাদের নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভবিষ্যতে তারা ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আবার অতিপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিস থেকে শুরু করে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, শিশু পড়াশোনায় ভালো করতে পারবে না এবং তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তিনি বলেন, ‘শিশুদের বিকাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় রয়েছে। জন্মের পর প্রথম দুই বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর পাঁচ ও ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তাদের শরীর ও মস্তিষ্কের বিকাশ দ্রুত ঘটে। তাই এ সময় শিশুদের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের জন্মের পর থেকেই যথাযথ যত্ন নেয়া হলে একটি সুস্থ ও সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যথায় শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক—দুই দিক থেকেই দুর্বল জনগোষ্ঠী তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। একইভাবে স্থূলতায় ভোগা মানুষ ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। স্থূলতার কারণে তাদের শারীরিক কর্মক্ষমতাও কমে যেতে পারে।’

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৫৭ লাখে। অন্যদিকে এসওএফআই-২০২৬ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৬৬ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক স্থূলতায় ভুগছেন। এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অনুপাতের দিক থেকে হার তুলনামূলক কম হলেও উদ্বেগের বিষয় হলো মাত্র এক যুগে স্থূলতায় ভোগা প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা ১৭৫ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে স্থূলতা এখন আর শুধু উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর বিস্তার ঘটছে। নগরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা, শারীরিক শ্রম কমে যাওয়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ফাস্টফুডের ব্যবহার বৃদ্ধি, অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের তুলনামূলক বেশি দাম এ প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, স্থূলতা শুধু অতিরিক্ত ওজনের বিষয় নয়; এটি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। এর ফলে স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ে, কর্মক্ষমতা কমে এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হয়।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা নয়; বরং স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার সবার নাগালের মধ্যে আনা। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় ক্যালরি পেলেও পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় খাদ্য গ্রহণ করতে পারছে না। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল ও সবজির মতো পুষ্টিকর খাবারের উচ্চ মূল্য নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে তুলনামূলক কম দামে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত কিন্তু কম পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুষ্টি সংকট মোকাবেলায় শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, মা ও শিশুর পুষ্টি কর্মসূচি জোরদার করা, স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্যকর খাদ্য কর্মসূচি সম্প্রসারণ, পুষ্টি বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং মানুষকে নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করার ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ্লায়েড নিউট্রিশনিস্ট ডা. জয়াশীষ রায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনের জন্য প্রধানত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব দায়ী। স্থূলতার কারণে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আমরা মানুষকে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের পরামর্শ দিচ্ছি। পাশাপাশি শিশুদের জন্যও প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে। তাদের নিয়মিত ন্যূনতম পাঁচ ধরনের সুষম খাদ্য উপাদান দেয়া, শারীরিক পরিশ্রম হয় এমন খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং মোবাইল ফোন থেকে দূরে রাখার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে স্কুল পর্যায়ে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস এবং তাদের কোন ধরনের খাবার দেয়া উচিত, সে বিষয়েও কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।’

আরও