চার বছর মেয়াদি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে বাকি মাত্র নয় মাস। অথচ এখনো শুরু হয়নি চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিএমইউ) অবকাঠামো নির্মাণকাজ। ফৌজদারহাট লিংক রোডসংলগ্ন নির্ধারিত ২৩ দশমিক ৯২ একর জমিতে থাকা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তি ও প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য নতুন জমি খুঁজতে নয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে সংসদে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সিএমইউ) আইন পাস হয়। ২০১৭ সালের ১৭ মে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ডিপিপি তৈরি ও মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৩ সালে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। ২০২৩-এর জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্পের তিন বছর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই।
ফৌজদারহাট লিংক রোডসংলগ্ন বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ২৩ দশমিক ৯২ একর জমিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। জমিটি সরকারি হওয়ায় এর জন্য কোনো অধিগ্রহণ ব্যয় ধরা হয়নি। তবে নির্ধারিত জায়গায় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি), ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি ও নার্সিং কলেজ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তি দেখা দেয়। এসব প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেয়া, তাদের জন্য বিকল্প অবকাঠামো তৈরি ও হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। এ কারণে নির্ধারিত জমিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি বিআইটিআইডির বর্তমান ভবন ১০ তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে দুই হাসপাতালের জন্য ২৫০টি করে মোট ৫০০ শয্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৭০০ শয্যা রাখার পরিকল্পনা করা হয়। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এক হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বিআইটিআইডি ভবনের তৃতীয় তলায় অস্থায়ী কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে।
সিএমইউ সূত্রে জানা গেছে, নানা জটিলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণে নতুন জায়গা দেখার নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নতুন জমি খুঁজতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সচিবকে আহ্বায়ক ও স্বাস্থ্যসেবা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে (নির্মাণ ও মেরামত) সদস্য সচিব করে নয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ জুলাই এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি হলেও এখনো কমিটির প্রথম সভা হয়নি। এরই মধ্যে জঙ্গল সলিমপুরসহ বেশ কয়েকটি জায়গা দেখা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সিএমইউর নির্বাহী প্রকৌশলী ফরহাদ রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন আপত্তি ও সংকটের কারণে নির্ধারিত জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা যাচ্ছে না। এ কারণে মন্ত্রী নতুন জায়গা খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের খাসজমি এবং ভালো লোকেশনের জায়গা খোঁজা হচ্ছে।’ নির্ধারিত স্থানে থাকা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাতে হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও জানান তিনি।
প্রকৌশলীরা জানান, বাজেটের অর্থছাড়, ডিপিপির নির্দেশনায় ঘাটতি, নকশা অনুমোদন, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, ভিসি নিয়োগ, সিডিএর নকশা অনুমোদন এবং বিভিন্ন দপ্তরের ছাড়পত্র পেতে সময়ক্ষেপণের কারণে নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি।
মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে জটিলতার কথা জানিয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক ডা. এসএম নুরুল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উদ্বোধনের পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই হাসপাতালের ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করা হলেও এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের মতামত নেয়া হয়নি। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হাসপাতালটি সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাবও আট বছর ধরে ঝুলে আছে। বিকল্প হিসেবে বিআইটিআইডি ভবনে ২৫০ শয্যার ব্যবস্থা করার কথা বলা হলেও সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য এমন ব্যবস্থা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘ফৌজদারহাটের নির্ধারিত জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ হচ্ছে না। বিকল্প জমি খুঁজতে কমিটি করা হয়েছে। কমিটি জমি নির্বাচন, ডিপিপি, নির্মাণ পরিকল্পনা ও বাজেট সংস্কার করে নতুন বরাদ্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।’
প্রকল্পে ৭০০ শয্যার হাসপাতাল, একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন, লাইব্রেরি, হোস্টেলসহ মোট ২৭টি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ১০টি ফ্যাকাল্টির অধীনে ৬৯টি চিকিৎসা বিভাগে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট কোর্স চালুর পাশাপাশি বছরে ৭৯০ শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পনাও রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের শেষ সময়ে এসে নতুন জমি নির্বাচন, ডিপিপি সংশোধন ও নতুন বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হলে নির্মাণকাজ শেষ করতে আরো দীর্ঘ সময় লাগবে। এতে চট্টগ্রামসহ এ অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের প্রত্যাশিত উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অপেক্ষাও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।