এডিস মশার উপদ্রব কমাতে মশা নিধনের পাশাপাশি প্রজননচক্র নিয়ন্ত্রণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন (আইআরইএস)-এর গবেষকরা তৈরি করেছেন ‘ডেন-এক্স ট্র্যাপ’ নামের এক যন্ত্র।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মেডিকেল এন্টোমোলজিস্ট ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ বছরের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তৈরি হয়েছে এ ফাঁদ। স্বাভাবিক প্রজনন আচরণকে কাজে লাগিয়ে এডিস মশার জীবনচক্রে বাধা সৃষ্টি করাই এ প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য।
কালো-লাল রঙের প্লাস্টিকের নলের মতো দেখতে ডেন-এক্স ট্র্যাপের ওপরের দিকে রয়েছে মশার প্রবেশের জন্য বিশেষ ছিদ্র। ভেতরে রাখা হয় পানি ও দেশীয় উদ্ভিদ থেকে তৈরি বিশেষ আকর্ষক উপাদান। স্ত্রী এডিস মশা উপযুক্ত স্থান হিসেবে ট্র্যাপটিকে বেছে নিয়ে সেখানে ডিম পাড়লেও পরবর্তী পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ মশা তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এটি কোনো স্প্রে বা বিষ নয়; বরং মশার নিজের আচরণকেই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য মশাকে তাড়ানো নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে নিজেই এসে তার জীবনচক্র সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হবে।
ডেন-এক্স ট্র্যাপ তৈরির ধারণার পেছনে রয়েছে অধ্যাপক কবিরুল বাশারের বিদেশী গবেষণার অভিজ্ঞতা। জাপানে পিএইচডি গবেষণার সময় তিনি মশা নিয়ন্ত্রণে একটি প্লাস্টিকের ফাঁদ ব্যবহার করেছিলেন। দেশে একই ধরনের ফাঁদ আনতে গিয়ে উচ্চ ব্যয় ও আমদানি-সংক্রান্ত জটিলতার মুখোমুখি হন তিনি।
গবেষকের তথ্যানুযায়ী, বিদেশী একটি মশার ফাঁদ দেশে আনতে ২২ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। ডেঙ্গুপ্রবণ বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা কঠিন। তাই স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে কম খরচে কার্যকর ফাঁদ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়।
ফাঁদের আকর্ষক উপাদান তৈরিতেও দেশীয় উপকরণকে গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মানো শতাধিক দেশীয় উদ্ভিদ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। এসব উদ্ভিদের নির্যাস ও গন্ধ এডিস মশার ডিম পাড়ার আচরণে কী প্রভাব ফেলে, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ গবেষণার পর দুটি দেশীয় উদ্ভিদের সমন্বয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ আকর্ষক উপাদান।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানান, ডেন-এক্স ট্র্যাপ পরিচালনায় বিদ্যুৎ বা ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না। এতে কোনো মোটর বা জটিল যন্ত্রাংশও নেই। ফলে স্থাপন ও ব্যবহার তুলনামূলক সহজ।
গবেষকদের দাবি, এটি বিষমুক্ত হওয়ায় রাসায়নিক কীটনাশকের মতো সরাসরি রাসায়নিক সংস্পর্শের ঝুঁকিও কম। তবে তারা এটিকে কীটনাশকের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখছেন না; বরং সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চান।
গবেষণাগারে প্রযুক্তিটি তৈরির পর বিভিন্ন বাস্তব পরিবেশে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সাভারের বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, ঢাকা মহানগর ও চট্টগ্রামের কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনসহ বিভিন্ন স্থানে ট্র্যাপ স্থাপন করে পরীক্ষা চালানো হয়। এসব পরীক্ষায় ফাঁদে এডিস মশার ডিম ও লার্ভার উপস্থিতি এবং পরিবেশভেদে এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় প্রতি ফাঁদে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩০০-৩৫০টি পর্যন্ত এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। তবে স্থানভেদে এ সংখ্যায় পার্থক্য দেখা গেছে। এডিস মশার ঘনত্ব বেশি এমন এলাকায় ফাঁদে লার্ভার পরিমাণও বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষক দল এ প্রযুক্তির পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছে। তবে গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে বৃহৎ পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক কবিরুল বাশার।