বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়িয়েও অনেক উদ্যোক্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন ধরে রাখতে পারছেন না। কাঁচামাল আমদানিতে এখনো ডলার মিলছে না চাহিদা অনুযায়ী। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের দামে ঊর্ধ্বগতি এবং চাহিদা সবকিছুর বিবেচনায় উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহৃত থাকছে। দেশের ভারী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ইস্পাত, সিমেন্ট, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন খাতে এরই মধ্যে কমে গেছে অন্তত ৩০ শতাংশ উৎপাদন। চতুর্মুখী এ চাপে শিল্প-কারখানা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বৃহৎ শিল্প গ্রুপগুলোকে।
বন্দর সুবিধা ও বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে ভারী সব শিল্প-কারখানা। দেশের প্রথম ইপিজেডসহ বেশ কয়েকটি শিল্পাঞ্চল ঘিরেই যত কর্মচাঞ্চল্য। নতুন করে তৈরি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর, যা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, গত দুই দশকে অর্থনীতির রূপান্তরে মূল ভূমিকা ছিল উৎপাদনমুখী শিল্পের। এ সময়ে উৎপাদনমুখী খাত শুধু বড় হয়নি, বৈচিত্র্যও এসেছে। সব মিলিয়ে এ শিল্পের আকার ক্রমেই বড় হয়েছে। তবে বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব বিবেচনায় আগামীতে ভারী শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে স্থবির হয়ে পড়েছে বিদ্যমান শিল্প-কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। এ পরিস্থিতি সহনীয় করে শিল্প খাতের অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে যদিও নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এখন পর্যন্ত।
ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দেশের মেগা প্রকল্পসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজ ইস্পাত খাতের চাহিদা দ্রুত বাড়িয়েছে। ব্যবসার ভবিষ্যৎ দেখে এ খাতের কোম্পানিগুলোও তাদের বিনিয়োগ ও সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সংযোজন করা হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। যদিও মোট বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যাংক ঋণ। ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। শুল্ক মূল্যায়ন ও সর্বনিম্ন কর বিবেচনায় ব্যবসার খরচ দেশের ইতিহাসে এখন সর্বোচ্চ। অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে চলতি মূলধন।
বড় উদ্যোগ নিয়ে বিলেটসহ বছরে মোট ১০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে চট্টগ্রামভিত্তিক জিপিএইচ ইস্পাত। দেশে প্রথমবারের মতো কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তির রড বাজারে এনেছে কোম্পানিটি। তাদের উৎপাদিত পণ্য রফতানি হচ্ছে শ্রীলংকা, চীনসহ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে। ইস্পাত উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষস্থানে থাকা চীনের বাজারে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো বিলেট রফতানির কৃতিত্বও প্রতিষ্ঠানটির। জানতে চাইলে জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুগের প্রয়োজনেই সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করে উন্নত মানের রড তৈরিতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের স্থানে যেতে পেরেছি। এখন চতুর্মুখী চাপ তৈরি হয়েছে ভারী এ শিল্প খাতে। উৎপাদিত পণ্যের আগে যে সেল ছিল তার প্রায় ৪০ শতাংশের মতো ড্রপ করেছে। ডলারের প্রাইস বাড়ার কারণে আমাদের ক্যাপিটাল রিকোয়ারমেন্ট বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এর ওপর ভ্যাট, ট্যাক্স, ইন্টারেস্ট, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ আনুষঙ্গিক আরো খরচ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ এ দুটি জায়গা অ্যাড্রেস করলে দেখা যাচ্ছে আগে যেখানে একটা শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালাতে ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতো, এখন লাগছে ১৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিলম্বিত দায় পরিশোধ করার জন্য ক্যাপিটাল লস হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশের মতো। সবকিছু মিলিয়ে একটা বড় কঠিন সময় ফেস করতে হচ্ছে বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনায়।’
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে চট্টগ্রামে দুটি আলাদা ইস্পাত কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে মোস্তফা হাকিম গ্রুপ। স্বয়ংক্রিয় এ দুটি কারখানার একটি সীতাকুণ্ডে ও অন্যটি কর্ণফুলী উপজেলায়। তাদের রড উৎপাদনক্ষমতা দিনে ১ হাজার ৬০০ টন। কাঁচামালসহ নানা সংকটের কারণে উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে ৩০ শতাংশেরও বেশি। মোস্তফা হাকিম গ্রুপের পরিচালক মো. সরওয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে গত কয়েক বছর অর্থনৈতিক অঞ্চল, সেতু, যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণসহ অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এসব প্রকল্প ইস্পাত খাতের চাহিদা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সামনের দিনগুলোয় এ ধারা অব্যাহত থাকবে ধরে নিয়ে আমরাও বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছি। এখন যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমাদের নিজের প্রতিষ্ঠানই শুধু নয়, গোটা খাতের জন্যই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।’
বর্তমান প্রেক্ষাপটে উৎপাদন কমিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প নেই জানিয়ে সরওয়ার আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামের অনেক ইস্পাত কারখানাই যারা আগে তিন শিফটে কার্যক্রম চালাত তারা এখন দুই কিংবা এক শিফটে উৎপাদন ব্যবস্থা নামিয়ে এনেছে। ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল হিসেবে যে পরিমাণ স্ক্র্যাপ আর কেমিক্যাল দরকার তার ৫০ শতাংশ এলসি পাচ্ছি কিংবা তারও কম। আবার এলসির ক্ষেত্রে আগে যেখানে তিনদিনের মধ্যে হতো সেখানে ২০-২৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। ফার্নেসের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার জায়গায় মিল চালাচ্ছি ১৬ ঘণ্টা। আর রোলিং মিলের ক্ষেত্রে ৮ ঘণ্টা করে সপ্তাহে চারদিন চালাতে হচ্ছে। কারণ বিলেট উৎপাদন কমে গেছে ৪০ শতাংশের মতো।’
ইস্পাত খাতের কাঁচামাল প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর, যা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে আসে। ফলে আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে এ খাতে উৎপাদন ব্যবস্থার একটা ধারণা পাওয়া যায়। রড তৈরির প্রধান দুটি কাঁচামাল পুরনো লোহা ও পুরনো জাহাজ। এর মধ্যে বিদায়ী অর্থবছরে পুরনো লোহার টুকরো আমদানি হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ২৭৩ কোটি ডলারের এ কাঁচামাল। একইভাবে পুরনো জাহাজ আমদানিও অর্ধেকে নেমেছে। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে স্ক্র্যাপ জাহাজ আনা হয়েছে ১৪৭টি, যা ১৯ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যান্য শিল্পেরও কাঁচামালসহ প্রায় সব ধরনের আমদানি কমায় প্রায় সময়ই ফাঁকা থাকছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের জেটিগুলো। নেই কোনো পণ্যজট।
দেশের বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম)। নতুন কারখানা স্থাপনের পর শিল্প গ্রুপটির এখন বছরে রড উৎপাদনক্ষমতা ১৮ লাখ টন আর বিলেট উৎপাদনক্ষমতা ২৪ লাখ টন। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও তাদের উৎপাদন কার্যক্রম রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে রড ও বিলেটের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছি। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলাটা এখনো আমাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে সময়ও লাগছে অনেক বেশি। উৎপাদন ঠিক রাখতে অন্তত চার মাসের কাঁচামাল স্টক করে রাখতে হয়। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ফলে চাহিদামতো এলসি খুলতে পারা এবং জটিলতা নিরসন এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।’
ইস্পাত খাতের আরেক বড় প্রতিষ্ঠান কবির স্টিল রি-রোলিং মিলস (কেএসআরএম)। চাহিদা বাড়ায় চট্টগ্রামভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপের পমিনি প্রযুক্তিতে নিজেদের কারখানার রড উৎপাদনক্ষমতা আট লাখ টনে উন্নীত করেছে। একই সঙ্গে রডের মধ্যবর্তী কাঁচামাল বিলেট উৎপাদনেও বড় সম্প্রসারণে গেছে। কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম যখন পড়ে যায় তখন সুযোগটি নিতে পারাটা জরুরি। তবে চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে না পারায় সময়মতো তা সম্ভব হয়নি। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। এসব কারণে রডের দাম বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে এবং এ খাতের বিক্রিও কমেছে। এখন আবার আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে শুরু করেছে এ খাতের অপরিহার্য কাঁচামালের দাম। উৎপাদন খরচ বেড়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে খাতটিতে।’
উৎপাদন কমেছে নির্মাণ খাতের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সিমেন্টেরও। এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্পটির প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার, স্লাগ, লাইমস্টোন, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসাম—সবই আমদানি করে তৈরি করতে হয় সিমেন্ট। তবে এসব কাঁচামাল আমদানিতে এখনো বড় বাধা ডলার সংকট। পাশাপাশি আমদানি এলসি খোলায় জটিলতা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়বৃদ্ধি, চাহিদার ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির কারণে পণ্যটির উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে। আবার কাঁচামালের প্রকৃত আমদানি মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে শুল্কায়ন করায়ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। নানা ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির চাপে থাকা সিমেন্ট খাতের এখন নাজুক পরিস্থিতি।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডলার সংকটসহ আরো অনেক কারণে সিমেন্ট খাত বেশ ভালোই সাফার করছে। এ খাতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ। গত বছরই কারখানা সম্প্রসারণ করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছিলাম ২৬ হাজার টনে। কিন্তু এখন ৫০ ভাগও উৎপাদন করতে পারছি না।’
উন্নত মানের প্লাস্টিকপণ্য তৈরি করে চট্টগ্রামভিত্তিক এন মোহাম্মদ গ্রুপ। দেশের বাজারে প্রথম প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটি বতর্মানে প্রায় দেড় হাজার রকমের পণ্য উৎপাদনে যুক্ত। জাপান, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়ও তারা এসব পণ্য রফতানি করছে। তবে নানা সংকটের কারণে তাদেরও উৎপাদন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এন মোহাম্মদ প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রির শতভাগ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। ডলার সংকটের কারণে বর্তমানে চাহিদার চেয়ে প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ কম এলসি করতে পারছি। ডলার রেটের কারণে খরচ বেড়ে গেছে বহুগুণ। আবার বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ জ্বালানি খরচ বৃদ্ধিও উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে অপ্রত্যাশিত খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন ১০০ টনের জায়গায় আমাদের উৎপাদন নেমে এসেছে ৬০-৬৫ টনে।’