এলডিসি উত্তরণ পেছনো বিষয়ক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল “ভার্চুয়াল কনসালটেশন উইথ কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি অন বাংলাদেশ’স রিকুয়েস্ট ফর অ্যান এক্সটেনশন অব প্রিপারেটরি পিরিয়ড” শীর্ষক এ সভায় অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। এতে উপস্থিত ছিলেন ইউএনসিডিপি চেয়ারম্যান জোসে আন্তোনিও ওকাম্পো। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রীসহ অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এতে অংশ নেন। এছাড়া যোগ দেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কর্মকর্তারাসহ বেসরকারী খাতের অংশীজনরা।
সুত্র জানিয়েছে, শুনানিতে বাংলাদেশ সময়সীমা বাড়াতে চাওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিল ইউএনসিডিপি। বাংলাদেশের উল্লেখ করা কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ঘাটতি, মূল সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের মন্থর গতি এবং ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব।
সভায় অংশ নেয়া বক্তারা বলেছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ধাক্কার কারণে একটি নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা কভিড পরবর্তী সময়ে সর্বনিম্ন। গত তিন দশকের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো বেসরকারী বিনিয়োগ ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। এছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।
বর্তমান সময়সীমা অনুসারে, বাংলাদেশ চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণ করার কথা। তবে বক্তারা জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ বর্তমানে চাপে থাকা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই সরকার উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আরো ৩ বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। এটি কোনো বিলম্ব করার কৌশল নয়, বরং একটি টেকসই এবং অপরিবর্তনীয় উত্তরণ নিশ্চিত করার জন্য নেয়া দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। সরকার নিশ্চিত করেছে যে ২০২৯ সালের পর আর কোনো সময় বাড়ানোর অনুরোধ করা হবে না।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা সমজাতীয় অর্থনীতির তুলনায় অত্যন্ত কম। করের পরিধি বাড়িয়ে এবং বিভিন্ন আইনি ফাঁকফোকর ও ছাড় বন্ধ করে এ অনুপাত ৯ দশমিক ২ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এতে দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং বিনিয়োগের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে জানিয়েছে, রফতানিখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বজায় রাখতে জাপানের সঙ্গে এরই মধ্যে ইপিএ (অর্থনৈতিক অংশিদারত্ব চুক্তি) সই হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, নিউজিল্যান্ড, ওমান এবং ইউএইর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) সই করার জন্য প্রভাব মূল্যায়ন চলছে। জিএসপি প্লাস সুবিধার ক্ষেত্রে পোশাক রফতানির ৩৭ শতাংশের যে থ্রেশহোল্ড বা সীমা রয়েছে, তা বাংলাদেশ এরই মধ্যে অতিক্রম করেছে, তাই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এ অতিরিক্ত সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া এবং শিল্পায়ন হ্রাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সভার বক্তরা। তারা বলছেন, আগামী ৩ বছর সময়ের মধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করছে বাংলাদেশ। ওষুধ শিল্পকে সফলতার একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যা অন্যান্য দেশের জন্য রোল মডেল হতে পারে।
বর্তমান রাজনৈতিক সরকার মাত্র দুই মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছে এবং তাদের পাঁচ বছরের পূর্ণ জনসমর্থন বা ম্যান্ডেট রয়েছে। সরকার তার মেয়াদের মধ্যেই বাংলাদেশকে সফলভাবে এলডিসি থেকে পরবর্তী উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অর্থনীতি বর্তমানে যে ‘লো-লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম ট্র্যাপ’-এ রয়েছে, তা থেকে উত্তরণে এই অতিরিক্ত সময়কাল কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ হতে।
এর আগে গত মার্চে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি এখনো অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নানা ধাক্কার প্রভাবে রয়েছে। এর মধ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধও অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেদনটিতে ২০১৭-২৬ সময়কালে একাধিক বিঘ্নের কথা উল্লেখ করা হয়। জলবায়ু ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আগেই শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী সামষ্টিক অর্থনৈতিক মন্থরতা, কভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি এবং লেনদেন ভারসাম্যের ওপর চাপ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করলেও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি রয়ে গেছে। যেমন বাণিজ্য সুবিধা হারানোর আশঙ্কা, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতি।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বর্তমান সরকার ও এর আগের অন্তর্বর্তী সরকারকে বিষয়টি অবহিত করেছেন তারা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার ইউএনসিডিপির চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরো সময় প্রয়োজন উল্লেখ করেছিল। বাংলাদেশের ওই আবেদনের পর ইউএনসিডিপি ফেব্রুয়ারির বার্ষিক বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা করে এবং প্রস্তাব মূল্যায়নের একটি প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়।