আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দুটি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত রাজবাড়ী জেলায় মোট ভোটার ১০ লাখ ৪ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে অনেকেই প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বিগত নির্বাচনগুলোয় দুটি আসন বেশির ভাগ সময়ই আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে না থাকায় বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বিএনপির জন্য। একটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তবে পিছিয়ে নেই জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা। নির্বাচনে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে থাকবেন তারা। যদিও ভোটাররা বলছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নিলেও তাদের বিপুলসংখ্যক ভোটার ফলাফলে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট লিয়াকত আলী বাবু বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও তাদের ভোট রয়েছে। তাদের ভোটগুলো কোনদিকে যাবে তা বলা কঠিন। তবে এই ভোট ফলাফলের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে থেকে রাজবাড়ীর দুটি আসনেই ধানের শীষের বিজয় ছিনিয়ে আনব।’
আসনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভা নিয়ে রাজবাড়ী-১ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫২ হাজার ১৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৪৩, নারী ২ লাখ ২২ হাজার ৮৩৯ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১০ জন।
বিগত নির্বাচনগুলোর তথ্য বলছে, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডা. এসএ মালেক নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে গোলাম মোস্তফা, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির আক্কাস আলী মিয়া ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে মুন্সি আব্দুল লতিফ (সম্মিলিত বিরোধী দল) নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী চৌধুরীর হাত ধরে আসনটিতে আবারো জয় পায় আওয়ামী লীগ। ১৯৯২ সালের উপনির্বাচনেও কাজী কেরামত আলীর হাত ধরে টানা জয় পায় আওয়ামী লীগ। তবে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির জাহানারা বেগম নির্বাচিত হন। অবশ্য একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হন কাজী কেরামত আলী। ২০০১ সালের নির্বাচনে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের হাত ধরে আসনটির দখল নেয় বিএনপি। অবশ্য ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবারো জয় পান আওয়ামী লীগের কাজী কেরামত আলী। ২০১৮ সাল পর্যন্ত আসনটি কেরামত আলীর দখলেই ছিল।
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপির হয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন সাবেক এমপি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। এছাড়াও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন রাজবাড়ী জেলা জামায়াতের আমির ও দলটির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. নুরুল ইসলাম। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আরো রয়েছেন জাতীয় পার্টি অ্যাডভোকেট মো. হাবিবুর রহমান বাচ্চু ও জাকের পার্টির মোহাম্মদ আলী বিশ্বাস।
এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ও অ্যাডভোকেট আসলাম মিয়া। তবে আলী নেওয়াজ পাওয়ায় প্রথম দিকে কিছুটা ক্ষোভ থাকলেও বর্তমানে ঘোষণা দিয়ে প্রচারণায় নেমেছেন আসলাম মিয়ার সমর্থকরা।
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ‘দলের অভ্যন্তরে ও বাইরে সমস্ত ভেদাভেদ, মতবিরোধ নিরসন করে আমরা এক হয়ে কাজ করছি। নির্বাচিত হলে পদ্মা ব্যারাজ, পদ্মা সেতু, বিশ্ববিদ্যালয়, নদীবন্দর, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, সংস্কৃতি নিয়ে আমি কাজ করব।’
অবশ্য জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জামায়াত প্রার্থী নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জনগণ আমাকে নির্বাচিত করলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেলার উন্নয়নমূলক কাজগুলো করব। মাদক নির্মূল করব। সুদ, ঘুস ও দুর্নীতিমুক্ত জেলা গঠন করব। এখন পর্যন্ত যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে বিপুল ভোটে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’
পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কালুখালী উপজেলার ২৪টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত রাজবাড়ী-২ আসনে ভোটার রয়েছে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৯০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৯, নারী ২ লাখ ৭০ হাজার ৮৫৩ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন পাঁচজন।
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একবার করে জয়লাভ করেছে। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী ডা. একেএম আসজাদ জয়লাভ করেন। অবশ্য এর পরের নির্বাচনগুলোয় জামায়াতে ইসলামী ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে চার দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী নাসিরুল হক সাবু। অন্য নির্বাচনগুলোয় আওয়ামী লীগের প্রাধান্যই দেখা গেছে।
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ। দলের মনোনয়ন পেয়েই তিনি ঐক্যের ডাক দেন। সাবেক এমপি নাসিরুল হক সাবুসহ মনোনয়নপ্রত্যাশী যারা ছিলেন সবার সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন রাজবাড়ী-২ আসনে বিএনপির মধ্যে যে বিভেদ ছিল, তা দূর হলো। অবশ্য পরবর্তী সময়ে নাসিরুল হক সাবু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন ভোটের মাঠে রয়ে গেছেন। যদি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
এছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন এনসিপির সাইয়েদ জামিল, জাতীয় পার্টির শফিউল আজম খান, গণঅধিকার পরিষদের জাহিদ শেখ, খেলাফত মজলিসের কাজী মিনহাজুল আলম, ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল মালেক, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের আব্দুল মালেক মণ্ডল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল মোল্লা।
ভোটাররা বলছেন, আসনটি ফিরে পেতে বিএনপি যেমন আপ্রাণ চেষ্টা চালাবে, তেমনি জামায়াত ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরাও চুপ থাকবেন না। জামায়াতে ইসলামী শরিক দল হিসেবে এনসিপিকে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমানে তাদের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য সাইয়েদ জামিল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নিলেও তাদের বিপুলসংখ্যক ভোটার ফলাফলে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনীতিকরা।
তবে বিএনপি প্রার্থী হারুন অর রশীদ বলেন, ‘বিএনপিতে কোনো কোন্দল নেই। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আছে। এটা সব দলেই থাকে। মনোনয়ন পাওয়ার পর সবার কাছেই যাচ্ছি। যেসব সমস্যা আছে তা মিটে যাবে। ধানের শীষ সবার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সবাই এক হয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবে; এটাই সত্যি।’
এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাইয়েদ জামিলকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় জোট। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী এলাকায় এরই মধ্যে কমিটি করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে। অনলাইন বেজ কাজ করছি। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। এ পর্যন্ত আমার যে টেবিল ওয়ার্ক করেছি, তাতে রাজবাড়ী-২ আসনে এনসিপি তথা ১১ দলের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।’
নির্বাচনের সার্বিক বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সুলতানা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এখন থেকেই নির্বাচনী মাঠে কেউ যাতে অন্যায়ভাবে প্রভাব বিস্তার না করতে পারে, সেজন্য সেনাবাহিনীর সদস্যসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন।’