মাদরাসায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ১০ শতাংশেরও কম

দেশে মাদরাসা শিক্ষায় বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা। তবে সরকারি পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, এ ধারায় মোট শিক্ষক বাড়লেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষকদের ৯০ শতাংশেরও বেশিরই প্রশিক্ষণ নেই।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন ‘শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪’-এর তথ্য বলছে, বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষকদের মধ্যে প্রশিক্ষিতের হার মাত্র ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ। এমনকি এ হার বিগত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অভাবই এ সংকটের প্রধান কারণ। গত কয়েক বছরে নতুন করে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক মাদরাসায় যোগ দিলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এছাড়া অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের একটি বড় অংশ সাম্প্রতিক সময়ে অবসরে গেছেন। তাদের জায়গায় নতুন নিয়োগ হলেও প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণ না হওয়ায় সামগ্রিকভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার কমে গেছে।

শিক্ষা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১২ সালে মাদরাসায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ছিল ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এ হার ১৯ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। ২০২১ সালে তা বেড়ে ২৬ শতাংশ অতিক্রম করে এবং ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক ৬৯ শতাংশে পৌঁছে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এ হার নেমে এসেছে ৯ দশমিক ১৯ শতাংশে।

নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রশিক্ষিত নারী শিক্ষকের হার ছিল ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ, পরের বছরই তা কমে মাত্র ৮ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষকের মোট সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১২ সালে যেখানে শিক্ষক ছিলেন ১ লাখ ৭ হাজার ৭২৮ জন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫২২ জনে। অর্থাৎ গত ১৩ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে অন্তত ২০ হাজার ৭৯৪ শিক্ষক।

প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার হ্রাস পাওয়ার কারণ হিসেবে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ খুবই সীমিত। কার্যত একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে দক্ষ করে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষত সাম্প্রতিক সময়ে অনেক নতুন শিক্ষক যুক্ত হয়েছেন এবং পুরনোদের অনেকে অবসরে গেছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকায় নতুনদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।’

সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা পর্যাপ্ত নয় উল্লেখ করে কাতলাসেন কাদেরিয়া কামিল মাদরাসার এ অধ্যক্ষ বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়নে রয়ে গেছে যথেষ্ট ঘাটতি। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার মানেও এর প্রভাব পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।’

মাদরাসা শিক্ষা অনেক আগে থেকেই বৈষম্যের শিকার বলে অভিযোগ করেন দেলাওয়ার হোসেন আজিজী। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলায় পিটিআই রয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্যও জেলায় জেলায় রয়েছে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। অথচ মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য তেমন অবকাঠামো নেই। একইভাবে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা যেখানে মিড-ডে মিল, উপবৃত্তি, পোশাকসহ নানা সুবিধা পাচ্ছে; সেখানে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এসব থেকে বঞ্চিত। এমনকি সরকার সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা খাতে যেসব উদ্যোগের কথা বলছে তার বেশির ভাগই সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্রিক।’

শিক্ষা পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দাখিল থেকে কামিল স্তর পর্যন্ত মোট মাদরাসা রয়েছে ৯ হাজার ২৬৯টি। এর মধ্যে তিনটি মাদরাসা সরকারি এবং ৯ হাজার ২৬৬টিই বেসরকারি। তবে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি মাদরাসাগুলোর মধ্যে ৮ হাজার ২২৯টি এমপিওভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মূল বেতন-ভাতা সরকার দিয়ে থাকে।

এবতেদায়ি শাখা ব্যতীত মাদরাসা শিক্ষায় রয়েছে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ১৯১ শিক্ষার্থী ও ১ লাখ ২৮ হাজার ৫২২ শিক্ষক। যদিও এতসংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষিত করতে প্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কেবল একটি। সরকারি ও এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষকরাই সেখানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান।

গাজীপুরের বোর্ড বাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (বিএমটিটিআই) বর্তমানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ৪ হাজার ৪৩৫ শিক্ষক। তাদের বিপরীতে ইনস্টিটিউটে শিক্ষক রয়েছেন কেবল ১৭ জন। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীর অনুপাত ১:২৬১।

বিএমটিটিআইয়ের অধ্যক্ষ প্রফেসর মাহমুদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একমাত্র প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট হিসেবে মাদরাসা শিক্ষকের সংখ্যার তুলনায় আমাদের সক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন টিটিসিতেও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ চলমান। তাছাড়া এ ইনস্টিটিউটকে একটি একাডেমিতে রূপান্তর এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আরো ইনস্টিটিউট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সুতরাং বলা যেতে পারে সব শিক্ষককেই প্রশিক্ষণের আওতায় আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

সাধারণ শিক্ষার তুলনায় প্রশিক্ষণে মাদরাসা শিক্ষকদের পিছিয়ে থাকার তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা পরিসংখ্যানেও। বর্তমানে মাধ্যমিকে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ৬৬ দশমিক ১০ শতাংশ হলেও দাখিল স্তরে সে হার মাত্র ৯ দশমিক ৬৬। এছাড়া আলিম স্তরে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ১০ দশমিক ১৬, ফাজিল (পাস) স্তরে ১৭ দশমিক ১৭, ফাজিল (অনার্সে) ৭ দশমিক ৪৮ এবং কামিল স্তরে ৭ দশমিক ২৮।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমাদের দেশে মাদরাসা শিক্ষায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করলেও দীর্ঘদিন ধরেই এ ধারা অবহেলিত। আর এর জন্য মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হন শিক্ষার্থীরাই। যদি আমরা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে চাই তাহলে এ পরিস্থিতির অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।’

শিক্ষায় সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি উল্লেখ করে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা, এখানে সমন্বিত উদ্যোগ নেই। অথচ প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটির সমন্বয় থাকা জরুরি। বর্তমানে দেখা যায় পৃথক পৃথক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কিন্তু সরকার চাইলে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতি জেলা বা উপজেলায় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকেই বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত করে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারত। এতে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি ও পারস্পরিক সহযোগিতা তৈরি হতো, যা শিক্ষার উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত। এছাড়া সরকারের অবকাঠামোগত ব্যয়ও হ্রাস পেত।’

মাদরাসা শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে সাময়িক বলে মনে করছে। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের নানা উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন) মো. আবুল কালাম তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাদরাসা শিক্ষা আলাদা অধিদপ্তর হিসেবে গঠিত হয় ২০১৫ সালে। এর আগে এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ছোট অংশ ছিল। ফলে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। আলাদা অধিদপ্তর হওয়ার পর থেকেই আমরা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশ মাদরাসা ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে শিক্ষকদের প্রশাসনিক, বিষয়ভিত্তিক, আইসিটি ও ধর্মীয় শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায়ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

সম্প্রতি প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার হঠাৎ কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন নিয়োগ একটি বড় কারণ। গত বছর প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। নতুন যোগদানকারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে সময় লাগে। আবার আগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক অবসরে চলে গেছেন। ফলে সাময়িকভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার কমে গেছে। আবার অনেক শিক্ষক আগে যোগদান করেও প্রশিক্ষণের বাইরে ছিলেন, ধাপে ধাপে তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।’

অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে সরকারের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ঢাকার বাইরে সাতটি বিভাগীয় শহরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। এরই মধ্যে প্রস্তাব জমা দেয়া হয়েছে। এছাড়া অনলাইন-অফলাইন কোর্স, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমেও প্রশিক্ষণ বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী মাদরাসায় পড়ে। তাই শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে।’

আরও